খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeএক্সক্লুসিভ৮,৫০০ বছরের রহস্য! ৯ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত জীবন্ত দানবের সন্ধান

৮,৫০০ বছরের রহস্য! ৯ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত জীবন্ত দানবের সন্ধান

নীল তিমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী হলেও সবচেয়ে বড় জীব নয়। সেই মর্যাদা এখন ওরেগনের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা আর্মিলেয়ারিয়া ওস্টোয়ে নামের বিশাল ছত্রাকের দখলে। প্রায় ৯.৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই জীব হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে রয়েছে এবং এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীব বলতে অধিকাংশ মানুষই নীল তিমির কথা ভাবেন। বিশালাকার এই সামুদ্রিক প্রাণীকে দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর বৃহত্তম জীব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু অবাক করার মতো সত্য হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীব কোনো প্রাণী নয়। এটি একটি বিশাল ছত্রাক, যা বছরের পর বছর ধরে মাটির নিচে বিস্তৃত হয়ে রয়েছে এবং আকারের দিক থেকে নীল তিমিকেও অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের মালহিউর ন্যাশনাল ফরেস্টে লুকিয়ে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরিচিত জীবন্ত জীব। এটি হলো আর্মিলেয়ারিয়া ওস্টোয়ে (Armillaria ostoyae) নামের একটি পরজীবী ছত্রাক, যা সাধারণভাবে “হানি মাশরুম” নামে পরিচিত।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, এই একক জীব প্রায় ৯.৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। অর্থাৎ একটি ছোট শহরের সমান আয়তনের জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এর দেহ। বিস্ময়ের বিষয় হলো, মাটির উপরে যে মাশরুমগুলো দেখা যায়, সেগুলো আসলে এই বিশাল জীবের ক্ষুদ্র অংশমাত্র। এর প্রকৃত দেহ মাটির গভীরে বিস্তৃত রয়েছে।

১৯৮৮ সালে মালহিউর ন্যাশনাল ফরেস্টে অস্বাভাবিকভাবে বিপুল সংখ্যক গাছ মারা যেতে শুরু করে। বন বিভাগের বিশেষজ্ঞরা প্রথমে বিষয়টিকে সাধারণ রোগ বা পরিবেশগত সমস্যার ফল বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া উদ্ভিদরোগ বিশেষজ্ঞ গ্রেগ হুইপল গাছের শিকড় পরীক্ষা করে এক ভিন্ন সত্যের সন্ধান পান।

আরও পড়ুন :  পৃথিবীর একমাত্র সাগর যার কোনো কূল নেই! সারগাসো সাগরের অবিশ্বাস্য রহস্য

তিনি দেখতে পান, হানি মাশরুম নামের এক ধরনের পরজীবী ছত্রাক গাছগুলোর শিকড়ে আক্রমণ করছে। প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, ছত্রাকটি প্রায় দেড় বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। কিন্তু পরবর্তী ডিএনএ বিশ্লেষণ গবেষণায় দেখা যায়, এর বিস্তার ধারণার চেয়ে বহু গুণ বেশি।

প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা বুঝতেই পারেননি যে পুরো বনাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মাশরুম আসলে একই জীবের অংশ। বাইরে থেকে এগুলো আলাদা আলাদা মাশরুম মনে হলেও জিনগত পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে সবগুলো একই জীবের সঙ্গে সংযুক্ত।

এই আবিষ্কার জীববিজ্ঞানের জগতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করে। কারণ এত বড় আকারের একক জীবের অস্তিত্ব আগে কল্পনাও করা হয়নি।

হানি মাশরুমের সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে মাটির নিচে। ছত্রাকটির মূল দেহ তৈরি হয়েছে মাইসেলিয়াম নামে পরিচিত সূক্ষ্ম সাদা তন্তুর জাল দিয়ে। এই জালিকাগুলো মাটির ভেতর ছড়িয়ে পড়ে পুষ্টি সংগ্রহ করে এবং ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে।

মাটির উপরে যে মাশরুম দেখা যায়, তা মূলত প্রজননের জন্য তৈরি ফলদেহ। প্রকৃত জীবটি হলো মাটির নিচের মাইসেলিয়াম নেটওয়ার্ক।

আরও পড়ুন :  ২০২৭ সালে পৃথিবী বদলে দিতে পারে এল নিনো! কী বলছেন বিজ্ঞানীরা?

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই মাইসেলিয়াম প্রতি বছর প্রায় ০.৭ থেকে ৩.৩ ফুট পর্যন্ত নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। হাজার হাজার বছর ধরে এই বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ছত্রাকটি আজ পৃথিবীর বৃহত্তম পরিচিত জীব হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

এই ছত্রাকের সঠিক বয়স নির্ধারণ করা এখনও সম্ভব হয়নি। তবে গবেষকদের ধারণা, এর বয়স কমপক্ষে ২,০০০ বছর। অনেক গবেষণা বলছে, এটি ৮,৫০০ বছর পর্যন্ত পুরোনো হতে পারে।

কিছু বিজ্ঞানীর মতে, প্রকৃত বয়স ১০,০০০ বছরেরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সেই ধারণা সত্য হয়, তাহলে এটি মানবসভ্যতার বহু প্রাচীন সময় থেকেই পৃথিবীতে টিকে রয়েছে।

১৯৯২ সালে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী জেমস অ্যান্ডারসনের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায় যে আর্মিলেয়ারিয়া গোত্রের বিস্তৃত ছত্রাক কলোনিগুলো আসলে একক জীব হতে পারে।

পরবর্তীতে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে প্রায় ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত আরেকটি আর্মিলেয়ারিয়া ওস্টোয়ে শনাক্ত করা হয়। এই আবিষ্কারের পর ওরেগনের বিশাল ছত্রাকটিকে নিয়ে আরও গভীর গবেষণা শুরু হয়।

মার্কিন ফরেস্ট সার্ভিসের গবেষক ক্যাথরিন পার্কস ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিশ্চিত করেন যে মালহিউর বনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে থাকা ছত্রাকটি আসলে একটি মাত্র জীব। ২০০৩ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়।

আরও পড়ুন :  দেখতে আপেল, আসলে আম! ভারতের বিখ্যাত আইসক্রিম আমের অবাক করা রহস্য

পৃথিবীর বৃহত্তম জীব হিসেবে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি এই ছত্রাক বনজ পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও এটি পরজীবী হিসেবে গাছের ক্ষতি করতে পারে, তবুও মৃত ও দুর্বল উদ্ভিদ ভেঙে পুষ্টি পুনর্ব্যবহারে সহায়তা করে।

একই সঙ্গে এটি বিজ্ঞানীদের সামনে জীবনের বিস্তার, অভিযোজন ক্ষমতা এবং দীর্ঘায়ুর নতুন উদাহরণ তুলে ধরেছে। এত বিশাল আকারের একটি জীব যে হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকতে পারে, তা প্রকৃতির অসাধারণ ক্ষমতারই প্রমাণ।

নীল তিমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী হলেও সবচেয়ে বড় জীব নয়। সেই মর্যাদা এখন ওরেগনের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা আর্মিলেয়ারিয়া ওস্টোয়ে নামের বিশাল ছত্রাকের দখলে। প্রায় ৯.৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই জীব হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে রয়েছে এবং এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রকৃতির এই বিস্ময়কর সৃষ্টি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে এমন অনেক রহস্য রয়েছে যা এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। কখনও কখনও সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলো চোখের সামনে নয়, বরং মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকে।