ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সেরা তারকা বিরাট কোহলি আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাঁকে ‘কিং কোহলি’ বলা হয়। আইপিএলের ফাইনালে ব্যাট হাতে অসাধারণ ইনিংস খেলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে শিরোপা জয়ের পথে নেতৃত্ব দেন তিনি। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স শুধু ক্রিকেটপ্রেমীদেরই নয়, বিশ্বের অন্যান্য ক্রীড়াবিদদেরও মুগ্ধ করেছে। সেই তালিকায় এবার নাম লেখালেন ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হ্যারি কেন।
ফাইনাল ম্যাচে বিরাট কোহলি নিজের আইপিএল ক্যারিয়ারের দ্রুততম অর্ধশতক পূর্ণ করেন। শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং করে তিনি প্রতিপক্ষ বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁর দায়িত্বশীল ইনিংস আরসিবির জন্য শক্ত ভিত তৈরি করে দেয়।
শুধু রান করাই নয়, ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ছক্কা মেরে দলকে জয় এনে দিয়ে তিনি আবারও নিজের ‘চেজ মাস্টার’ পরিচয় তুলে ধরেন। এমন এক পারফরম্যান্সে ক্রিকেট বিশ্বের নজর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দিকে ঘুরে যায়।
ফুটবল ও ক্রিকেট দুই ভিন্ন জগতের খেলা হলেও বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান সবসময়ই দেখা যায়। আইপিএল ফাইনালের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যারি কেন বিরাট কোহলির প্রশংসা করে একটি বার্তা প্রকাশ করেন।
তিনি লিখেছেন, “অসাধারণ একজন খেলোয়াড় এবং দুর্দান্ত একটি ইনিংস, বিরাট কোহলি। আরসিবিকে পরপর শিরোপা জয়ের জন্য অভিনন্দন।”
হ্যারি কেনের মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলারের কাছ থেকে এমন প্রশংসা পাওয়া কোহলির আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তারই প্রমাণ। ক্রিকেটের সীমানা পেরিয়ে তাঁর প্রভাব যে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি আরও একবার স্পষ্ট হলো।
আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটারদের একজন বিরাট কোহলি। বয়স বাড়লেও তাঁর ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা এবং রান করার ক্ষুধা এতটুকুও কমেনি।
এই মৌসুমে তিনি মোট ৬৭৫ রান সংগ্রহ করে আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, টানা চারটি মৌসুমে তিনি ৬০০-এর বেশি রান করেছেন। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এমন ধারাবাহিকতা খুব কম ব্যাটারের পক্ষেই সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোহলির সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো পরিস্থিতি বুঝে ব্যাটিং করার দক্ষতা। তিনি কখন আক্রমণ করতে হবে এবং কখন ইনিংস গড়ে তুলতে হবে, তা খুব ভালোভাবেই জানেন।
ফাইনালের পর কোহলি বলেন, বর্তমান ক্রিকেট আগের তুলনায় অনেক বেশি গতিময় হয়ে উঠেছে। তরুণ ক্রিকেটাররা নতুন নতুন শট ও কৌশল নিয়ে খেলছে, যা অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদেরও নিজেদের উন্নত করতে বাধ্য করছে।
তাঁর ভাষায়, একজন খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিনিয়ত নিজেকে আরও ভালো করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে নিজের খেলায় পরিবর্তন আনাও জরুরি।
এই মানসিকতাই তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বের সেরা ব্যাটারদের কাতারে ধরে রেখেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই প্রতিপক্ষ দল চাপে পড়ে যায়। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোর কারণে তারা বড় স্কোর গড়তে ব্যর্থ হয়। ফলে লক্ষ্য তাড়ার সময় আরসিবি তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক অবস্থানে ছিল।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে বিরাট কোহলি ও তাঁর সঙ্গী শুরু থেকেই দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেন। তারা ইনিংসের ভিত্তি গড়ে দেন এবং ম্যাচকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন। মাঝপথে কয়েকটি উইকেট পড়লেও আরসিবির জয় নিয়ে খুব বেশি শঙ্কা তৈরি হয়নি।
শেষ পর্যন্ত কোহলির অভিজ্ঞতা এবং ম্যাচ ফিনিশ করার দক্ষতাই পার্থক্য গড়ে দেয়।
বর্তমানে বিরাট কোহলি আরসিবির অধিনায়ক না হলেও দলের ওপর তাঁর প্রভাব এখনো অপরিসীম। মাঠে তাঁর উপস্থিতি, সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা এবং চাপের মুহূর্তে দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা তাঁকে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
ম্যাচ শেষে তিনি দলের অন্য খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব দিলেও বাস্তবতা হলো, বড় ম্যাচে তাঁর অবদানই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে। নেতৃত্বের কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব না থাকলেও তিনি কার্যত দলের হৃদস্পন্দন হয়ে আছেন।
বিরাট কোহলির জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু তাঁর রান বা রেকর্ড দায়ী নয়। তাঁর লড়াই করার মানসিকতা, জয়ের প্রতি অদম্য আকাঙ্ক্ষা এবং ফিটনেসের প্রতি নিবেদন তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
ক্রিকেট মাঠে তিনি যেমন আবেগী, তেমনি নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে অত্যন্ত পেশাদার। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই তাঁকে কোটি কোটি ভক্তের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক বানিয়েছে।
আইপিএলের ফাইনালে আবারও তিনি দেখিয়ে দিলেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যা। সঠিক প্রস্তুতি ও আত্মবিশ্বাস থাকলে একজন খেলোয়াড় দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করতে পারেন।
আইপিএল ফাইনালে বিরাট কোহলির দুর্দান্ত ইনিংস শুধু আরসিবিকে শিরোপা এনে দেয়নি, বরং বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর মর্যাদাকেও আরও উঁচুতে নিয়ে গেছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের উচ্ছ্বাসের সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে ইংল্যান্ডের ফুটবল অধিনায়ক হ্যারি কেনের প্রশংসাও।
৬৭৫ রানের একটি স্মরণীয় মৌসুম, ফাইনালে দ্রুততম অর্ধশতক এবং ম্যাচজয়ী ইনিংস—সব মিলিয়ে আবারও প্রমাণ হয়েছে, ‘কিং কোহলি’ এখনো বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম উজ্জ্বল নাম। তাঁর ব্যাটের জাদুতে মুগ্ধ হচ্ছে শুধু ক্রিকেট বিশ্ব নয়, অন্যান্য খেলাধুলার তারকারাও।

