ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মানবপাচার এবং জাল পরিচয়পত্র তৈরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তদন্তকারীদের দাবি, একটি সুসংগঠিত চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে আসা ব্যক্তিদের জন্য ভারতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে দিচ্ছিল। এই অভিযোগের তদন্তে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের ১৩টি স্থানে একযোগে তল্লাশি চালানো হয়েছে। তথ্য সূত্র: আনন্দ বাজার পত্রিকা
তদন্তকারীদের ধারণা, এই চক্র শুধু জাল নথি তৈরি করেই থেমে থাকেনি; বরং কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন, মানবপাচার এবং ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের মাধ্যমেও একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। প্রাথমিক তদন্তে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নামও উঠে এসেছে, যেগুলোর আর্থিক লেনদেন এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ইডির বিশেষ দল পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি শুরু করে। একই সময়ে দিল্লি, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশের একাধিক স্থানেও অভিযান পরিচালিত হয়।
তদন্তের মূল লক্ষ্য ছিল এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া, যারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ভারতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ বা তৈরি করতে সহায়তা করছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইডির তদন্তে উঠে এসেছে, সীমান্ত অতিক্রম করে আসা কিছু ব্যক্তিকে ভারতের বিভিন্ন সরকারি পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে দেওয়ার জন্য একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র (ইপিক), প্যান কার্ড এবং ই-শ্রম কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি নথি তৈরি করে দেওয়া হতো। এসব নথির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বা বৈধ বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিতে সক্ষম হতেন।
তদন্তকারীদের মতে, জাল নথি পাওয়ার পর অনেককে পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে পাঠানো হতো। কর্নাটক, তামিলনাড়ু, পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে তাদের নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দালালচক্র সক্রিয় ভূমিকা পালন করত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই তদন্তের সূত্রপাত হয় উত্তরপ্রদেশ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) মানবপাচারবিষয়ক অনুসন্ধান থেকে। ওই তদন্তে কলকাতাভিত্তিক এক সন্দেহভাজন চক্রের সদস্যের সন্ধান পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে তদন্তের বিস্তার ঘটলে উত্তর ২৪ পরগনা এবং মুর্শিদাবাদে জাল নথি তৈরির একটি বড় নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার তথ্য সামনে আসে।
উত্তরপ্রদেশ পুলিশ আদালতে জানায়, শ্রমিক সরবরাহের আড়ালে কিছু দালাল অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের জাল নথি দিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে পাঠানোর কাজ করছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ইডির প্রাথমিক তদন্তে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আর্থিক কার্যক্রমও নজরে এসেছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, কিছু ক্ষেত্রে এনজিও বা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অর্থ লেনদেন এবং নথি তৈরির কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে।
তবে তদন্ত এখনও চলমান এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
তদন্তকারীরা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, আর্থিক নথি এবং ডিজিটাল লেনদেন বিশ্লেষণ করছেন, যাতে অর্থের উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
তদন্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে ইডি। অভিযোগ অনুযায়ী, মূল অভিযুক্তদের পরিচয় গোপন রাখতে একাধিক ‘ভাড়ার অ্যাকাউন্ট’ ব্যবহার করা হয়েছে।
ছোট ছোট অঙ্কে বিপুল সংখ্যক লেনদেন বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হতো। এই কৌশল ব্যবহার করে আর্থিক লেনদেনকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
অর্থ পাচার ও মানবপাচার সংক্রান্ত মামলায় এ ধরনের পদ্ধতি নতুন নয়। তবে এই মামলায় কত পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা জানতে আর্থিক নথি বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, মানবপাচার এবং জাল পরিচয়পত্র তৈরিকে ঘিরে বহু কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি, দালাল এবং আর্থিক সহযোগীদের শনাক্ত করাই বর্তমানে তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য।
তদন্তকারীদের মতে, জাল পরিচয়পত্রের মাধ্যমে শুধু অবৈধ বসবাস নয়, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং সুবিধা এবং অন্যান্য সরকারি পরিষেবাও গ্রহণ করা সম্ভব হয়। ফলে এ ধরনের অপরাধ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এর আগে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বনগাঁ এলাকায় নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক পাচার সংক্রান্ত তদন্তে অভিযান চালিয়েছিল।
সেই তদন্তেও একটি সংগঠিত জাল নথি তৈরির চক্রের অস্তিত্বের তথ্য সামনে আসে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি ছিল, এই ধরনের চক্র আন্তর্জাতিক মানবপাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করত এবং সীমান্ত অতিক্রমকারী ব্যক্তিদের পরিচয় গোপন রাখতে জাল নথি সরবরাহ করত।
ইডির অভিযান থেকে উদ্ধার হওয়া নথি, ডিজিটাল ডিভাইস, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ এখন বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারা এই চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী, কত বড় ছিল আর্থিক লেনদেন এবং কোন কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এতে জড়িত ছিল এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে আরও তল্লাশি বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তারা আইনগতভাবে অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচিত হবেন, দোষী নন।
ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মানবপাচার এবং জাল পরিচয়পত্র তৈরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই অভিযানকে তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।

