ঢাকার রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে ঘিরে চলমান বিতর্কের অবসান হওয়া প্রয়োজন। তার মতে, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার স্বার্থে এ বিষয়ে অযথা বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে।
ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত জুলাই শহীদ সাংবাদিক সম্মাননা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
মির্জা ফখরুল বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে জনগণকে বিভক্ত করার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। তিনি মনে করেন, জুলাই সনদ দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা বহন করে। ফলে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করা সব রাজনৈতিক দলের কর্তব্য।
তিনি আরও বলেন, মতভেদ থাকতেই পারে, তবে সেটি যেন সংঘাতের কারণ না হয়ে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ তৈরি করে। জাতীয় স্বার্থে সবাইকে সংলাপের সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে।
বক্তব্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষ্য, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অংশগ্রহণ ছাড়া কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম শক্তি হলো আলোচনা, যুক্তি এবং মতবিনিময়। তাই বাইরে থেকে সমালোচনা না করে সংসদ ও সংশ্লিষ্ট কমিটিতে অংশ নিয়ে মতামত তুলে ধরাই হবে গণতান্ত্রিক চর্চার সঠিক পথ।
মির্জা ফখরুল বলেন, জুলাই আন্দোলন দেশের সামনে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে সরকার কাজ করছে। বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, জনগণের আস্থা ধরে রাখতে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য সরকারের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক শক্তিকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে নানা ধরনের আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংঘাত হয়েছে। এখন সময় এসেছে সংসদকে কার্যকর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার।
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে মতবিরোধ থাকলেও সহিংসতার পথে যেতে হবে না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা এবং সংসদীয় আলোচনাকে কার্যকর করাই হতে পারে সেই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম উপায়।
মির্জা ফখরুল বলেন, সব বিষয়ে শুধু বিরোধিতা করার মানসিকতা দেশের জন্য ইতিবাচক নয়। তিনি বিরোধী দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় বিষয়ে সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।
তার মতে, উন্নয়ন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মতো বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন। এতে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তোষামোদ সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হলে এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তার মতে, ব্যক্তি বা ক্ষমতার প্রতি অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে নীতি, মূল্যবোধ এবং পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আরও কার্যকর ও জনগণের আস্থাভাজন হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, তা অল্প সময়ে দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন।
মির্জা ফখরুলের মতে, একটি রাষ্ট্রকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তার ভাষায়, সংলাপ, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক এবং স্থিতিশীল বাংলাদেশ পাবে। তথ্য সূত্র: বাসস

