স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন প্রস্তুতি ও আলোচনা তুঙ্গে, ঠিক সেই সময় নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ে নতুন একটি নিয়োগকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন মো. শামসুল আলম, যিনি অবসরের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তার এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিরোধী রাজনৈতিক দল, নির্বাচন বিশ্লেষক এবং সুশীল সমাজের একটি অংশ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে সরকার এবং বিএনপি বলছে, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং এটি নিয়ে অতিরিক্ত বিতর্কের প্রয়োজন নেই।
সম্প্রতি সরকার বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন ও সংস্থায় একাধিক সাবেক বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পান মো. শামসুল আলম।
নিয়োগের সময়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ অদূর ভবিষ্যতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সেখানে কর্মরত শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে বিশেষ সংবেদনশীলতা কাজ করে। ফলে একজন রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তির নিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বিরোধী দলগুলোর দাবি, নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক কাঠামোয় এমন একজন ব্যক্তির উপস্থিতি নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তারা মনে করছে, নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে এমন নিয়োগ রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়িয়ে তুলবে।
মো. শামসুল আলম কর্মজীবনের একটি বড় অংশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে কাটিয়েছেন। তিনি নির্বাচন পরিচালনা শাখায় দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৭ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান।
অবসরের পর তিনি সক্রিয়ভাবে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরবর্তীতে দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নেন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
অবসরের প্রায় আট বছর পর গত ২৩ জুলাই সরকার তাকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। এই নিয়োগই বর্তমান বিতর্কের মূল কারণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন আয়োজন নয়; পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রশাসনিক প্রস্তুতি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়, নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং নির্বাচন পরিচালনার নানা দিকেও সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
যদিও অতিরিক্ত সচিব সরাসরি নির্বাচন কমিশনের নীতিনির্ধারক নন, তারপরও তিনি প্রশাসনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ফলে এই পদে নিয়োজিত ব্যক্তির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে পুরো প্রতিষ্ঠানই বিতর্কের মুখে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন শুধু সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করাই যথেষ্ট নয়; জনগণের কাছে নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য বলেও প্রতীয়মান হতে হয়। তাই নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত কাউকে নিয়োগ দেওয়া জনআস্থার জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যদি কোনো কর্মকর্তা অতীতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হয়ে থাকেন, তাহলে সরকারি বিধি অনুযায়ী তাকে পদোন্নতি, আর্থিক সুবিধা বা অন্যান্য প্রাপ্য দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অবসরের পর সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার পর পুনরায় তাকে একই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
তাদের মতে, নির্বাচন কমিশনের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে শুধু আইনি বৈধতা নয়, নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হলে নির্বাচন নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদের মতে, নির্বাচন কমিশনের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)-এর হাতে। এরপর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভূমিকা পালন করেন সচিব। অতিরিক্ত সচিবের ক্ষমতা তুলনামূলক সীমিত।
তবে তিনি মনে করেন, প্রশাসনিক বিভিন্ন প্রস্তাব, নথি প্রক্রিয়াকরণ কিংবা অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সচিবের ভূমিকা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই যখন এই নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তখন সরকার চাইলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তার মতে, এই নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া কমিশনের নিজস্ব সিদ্ধান্তে হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কমিশনের দায়িত্ব।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কমিশন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিতে বাধ্য। ফলে কমিশনের অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে দেখা যাচ্ছে না।
এই নিয়োগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হলে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে জনগণের সন্দেহ আরও বাড়বে।
জামায়াতের নেতারা দাবি করেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনায় অতিরিক্ত সচিবের প্রশাসনিক দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই পদে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক থাকা উচিত নয়। তারা সরকারের কাছে দ্রুত এই নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অভিযোগ করেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার পরিবর্তে সরকার উল্টো দলীয়করণের পথে হাঁটছে। তাদের মতে, নির্বাচন কমিশনও সেই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকেনি।
বিএনপি অবশ্য এই সমালোচনার সঙ্গে একমত নয়। দলটির নেতারা বলছেন, সরকার যদি যোগ্য ও অভিজ্ঞ কাউকে নিয়োগ দিয়ে থাকে, তাহলে সেটি নিয়ে অতিরিক্ত বিতর্কের প্রয়োজন নেই।
বিএনপির ভাষ্য, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমির ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে বর্তমান নিয়োগকে কেন্দ্র করে অযথা বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।
তাদের মতে, একজন কর্মকর্তা অতীতে রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন বলেই তিনি দায়িত্ব পালনে পক্ষপাতদুষ্ট হবেন— এমন ধারণা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠা করা ঠিক নয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এই নিয়োগকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
তার মতে, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা জনগণের ছিল, এই ধরনের সিদ্ধান্ত সেই প্রত্যাশাকে দুর্বল করে। ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক সংকটও সৃষ্টি হতে পারে।
সুশীল সমাজের অনেকেই মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে নিরপেক্ষতা এবং জনবিশ্বাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে বাস্তবিক কোনো প্রভাব পড়ুক বা না-ই পড়ুক, জনমনে যদি পক্ষপাতের ধারণা জন্ম নেয়, সেটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে জনগণের আস্থার ওপর। ভোটাররা যদি মনে করেন নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ নয়, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেশের তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক পরিবেশকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই এই সময় নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সরকারের অবস্থান হলো, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক নিয়ম মেনেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার আইনগত ক্ষমতা তাদের রয়েছে এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, শামসুল আলম দীর্ঘদিন নির্বাচন কমিশনে কাজ করেছেন। তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক হতে পারে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা থাকলেও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত কি না, সেটিই এখন আলোচনার মূল বিষয়।
এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিরোধী দলগুলো বিষয়টি নিয়ে আরও কর্মসূচি দিতে পারে কিংবা নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানাতে পারে।
অন্যদিকে সরকার যদি নিয়োগ বহাল রাখে, তাহলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত আরও বেশি নজরদারির মধ্যে থাকবে।
সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন শুধু একজন কর্মকর্তার নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, জনআস্থা এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় পরিণত হয়েছে। তথ্য সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

