ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার করা উচিত বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিক। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক আমেরিকান আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার আলোকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এই ফলাফল মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইকোনমিস্ট/ইউগভ পরিচালিত সাম্প্রতিক জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করা উচিত কি না।
জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, মোট উত্তরদাতার ৪৯ শতাংশ মনে করেন, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের কারণে নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করা উচিত। বিপরীতে ২৭ শতাংশ এই মতের বিরোধিতা করেন এবং তাদের মতে, তাকে গ্রেফতার করা উচিত নয়। এছাড়া ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান নিতে পারেননি অথবা অনিশ্চিত মত প্রকাশ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের নাগরিকদের মধ্যে এমন মতামত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, এই জরিপ তারই একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের সময় সংঘটিত সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করছে। সেই তদন্তের অংশ হিসেবে আদালত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
আইসিসির অভিযোগে বলা হয়েছে, গাজায় পরিচালিত সামরিক অভিযানের সময় বেসামরিক জনগণের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা সীমিত করার অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে। আদালতের মতে, এসব অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে বলেই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
তবে ইসরায়েল সরকার শুরু থেকেই এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। দেশটির দাবি, হামাসের হামলার জবাবে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেই সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।
যদিও জরিপে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মার্কিন নাগরিক নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের পক্ষে মত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য নয়। ফলে আইসিসির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের ওপর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আইসিসির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিল। তারা আদালতের এখতিয়ার প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পরিচালিত তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করে।
এমনকি আইসিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন হেগভিত্তিক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা ও বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে।
জরিপটি এমন সময় প্রকাশিত হয়েছে, যখন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র সফরে রয়েছেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এই সফর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, গাজা যুদ্ধ, ইরান ইস্যু এবং দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এমন একটি সময়ে প্রকাশিত জনমত জরিপ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাদের মতে, সরকারি অবস্থান এবং সাধারণ জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মতামতের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে।
ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ মনে করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অভিযোগের ভিত্তিতে নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করা উচিত। মাত্র অল্পসংখ্যক ডেমোক্র্যাট এই মতের বিরোধিতা করেছেন।
অন্যদিকে রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে মাত্র ২৪ শতাংশ গ্রেফতারের পক্ষে মত দিয়েছেন। অধিকাংশ রিপাবলিকান মনে করেন, আইসিসির এই পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয় এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া উচিত হবে না।
স্বতন্ত্র বা কোনো দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এমন ভোটারদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ গ্রেফতারের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা ভোটারদের একটি বড় অংশও আইনি প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছেন।
জরিপে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল নেতানিয়াহু যুদ্ধাপরাধে দোষী বলে উত্তরদাতারা মনে করেন কি না।
এই প্রশ্নের উত্তরে অংশগ্রহণকারীদের মতামতও প্রায় একই ধরণের চিত্র তুলে ধরে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উত্তরদাতা মনে করেন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া উচিত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিচার হওয়া প্রয়োজন।
অবশ্য একটি অংশ মনে করেন, অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন হবে না।
নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য নিউইয়র্ক সফর নিয়েও অতীতে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনার সময় নিউইয়র্ক সিটির রাজনৈতিক মহলের কিছু অংশ থেকে তার বিরুদ্ধে আইসিসির পরোয়ানা কার্যকরের দাবি উঠেছিল।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয়, তবুও বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জরিপের ফলাফল কেবল একটি জনমত নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইসরায়েলকে ঘিরে জনদৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করে।
গত কয়েক বছরে গাজা সংঘাত, মানবিক সংকট এবং বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর ফলে অনেক পশ্চিমা দেশেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা বেড়েছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার প্রশ্নে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নিয়ে জনমতও আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
আইসিসির গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও বাস্তবে সেটি কার্যকর হবে কি না, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ওপর। যেসব দেশ আইসিসির সদস্য, তারা আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সেই সদস্যভুক্ত নয়।
ফলে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আদালতের পরোয়ানা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই নির্ভর করবে তিনি ভবিষ্যতে কোন দেশে সফর করেন এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অবস্থান কী হবে তার ওপর।
তবে সর্বশেষ এই জরিপ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং তারা মনে করেন, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রনেতার জন্য আলাদা সুবিধা থাকা উচিত নয়। অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মার্কিন নাগরিক এখনও আইসিসির পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন, যা দেশটির রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই জনমত জরিপ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতে গাজা যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক আদালতের কার্যক্রম এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের জনমতের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

