রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথিত টেলিফোন আলাপ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন মহলে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে অবশেষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন রাষ্ট্রপতি। তিনি এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা এবং কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযোগের পক্ষে যদি কেউ নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেন, তাহলে তা প্রকাশ্যে উপস্থাপনের আহ্বানও জানিয়েছেন।
বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হেলাল উদ্দিনের একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে। ওই পোস্টে তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে কথিত ফোনালাপের বিষয়টি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। এরপর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার একটি টেলিফোনে কথা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য, বিশ্লেষণ এবং জল্পনা দেখা যায়।
এই প্রেক্ষাপটে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হেলাল উদ্দিন একটি ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন, তিনি একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিষয়টিকে সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। সেই তথ্যের ওপর আস্থা রেখেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের মতামত প্রকাশ করেছিলেন।
তবে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরাসরি কথা হওয়ার পর তাঁর অবস্থান বদলে যায় বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
হেলাল উদ্দিনের বর্ণনা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ফোনে স্পষ্ট ভাষায় জানান, শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের টেলিফোন আলাপ হয়নি।
রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের খবর সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং কাল্পনিক। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি কোনো যোগাযোগের প্রয়োজনই হতো, তাহলে সেটি নিয়ে এমন গুঞ্জনের অবকাশ কোথায়? তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রচারিত তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
রাষ্ট্রপতি আরও জানান, যে জাতীয় ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনের কথা বলা হয়েছে, সেটিও তাঁর নজরে আসেনি।
এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে রাষ্ট্রপতির প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
হেলাল উদ্দিনের পোস্ট অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি বলেন, যদি কেউ তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে তিনি জনগণের যে কোনো রায় মেনে নেবেন।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, অভিযোগকে তিনি শুধু অস্বীকারই করছেন না, বরং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাইয়েরও আহ্বান জানাচ্ছেন।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে হেলাল উদ্দিন লেখেন, তিনি আগে একটি পোস্টে রাষ্ট্রপতি ও শেখ হাসিনার কথিত টেলিফোন আলাপের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন।
তাঁর দাবি, একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই তিনি বিষয়টিকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিলেন।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি ফোন করে বিষয়টি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করার পর তিনি পুরো ঘটনাটি নতুন করে তুলে ধরেন এবং রাষ্ট্রপতির বক্তব্যও প্রকাশ করেন।
এই পোস্ট প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
সাংবাদিক হেলাল উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে বলেন, তিনি নিয়মিত তাঁর ফেসবুক পোস্ট পড়েন।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ছিল, সাংবাদিকের পোস্টে উল্লিখিত তথ্য তাঁকে কষ্ট দিয়েছে। সেই কারণেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন।
এই অংশটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
হেলাল উদ্দিনের পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির দাবি অনুযায়ী তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিতর্কের মধ্যে টেনে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক খবর ছড়িয়ে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে।
তিনি মনে করেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া এ ধরনের তথ্য প্রচার হলে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি জনমনে ভুল ধারণাও জন্ম নিতে পারে।
কথোপকথনের একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি নিজের শারীরিক অবস্থার কথাও তুলে ধরেছেন বলে সাংবাদিক হেলাল উদ্দিন উল্লেখ করেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি বলেন তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতেও কষ্ট হচ্ছে।
তিনি নিজের সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন এবং দেশবাসীকেও তাঁর জন্য দোয়া করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই বক্তব্যের পর অনেকেই রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থা নিয়েও আলোচনা শুরু করেন।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিভিন্ন দাবি ভাইরাল হয়ে যায়। পরে দেখা যায়, সেসব তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্র, সরকার কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের আগে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে ভুল তথ্য দ্রুত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
এই ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন জনমত গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে একই সঙ্গে এটি গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারে।
একটি পোস্ট বা দাবি অল্প সময়ের মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাই তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রপতি ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে কথিত ফোনালাপের বিষয়টি রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা তৈরি করেছে। যদিও রাষ্ট্রপতি সরাসরি পুরো ঘটনাকে অস্বীকার করেছেন, তবুও বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতভেদ এবং আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন সংবেদনশীল বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেই আলোচনা হওয়া উচিত। গুজব বা অপ্রমাণিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

