বিশ্বকাপের আগে ফ্রান্স দলে অর্থের ঝলক
২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ফ্রান্স জাতীয় দল শুধু মাঠের শক্তিমত্তার কারণেই আলোচনায় নয়, তাদের খেলোয়াড়দের বিপুল আয়ও এখন ফুটবলবিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিশ্বের অন্যতম প্রতিভাবান ও গভীর স্কোয়াড হিসেবে বিবেচিত ফ্রান্স দলের তারকাদের সাপ্তাহিক ও বার্ষিক আয়ের হিসাব প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা গেছে, দলের ভেতরে বেতনের ব্যবধানও অবিশ্বাস্য রকমের বড়।
দিদিয়ের দেশাম্পের নেতৃত্বে গড়া ২৬ সদস্যের দলটি বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার। ২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ সালের রানার্সআপ ফ্রান্স এবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আবারও শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে। আর সেই স্বপ্নের পেছনে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কিছু ফুটবল তারকা।
কিলিয়ান এমবাপে: ফ্রান্স দলের সবচেয়ে ধনী ফুটবলার
ফ্রান্স দলের সর্বোচ্চ আয়কারী খেলোয়াড় হিসেবে সবার ওপরে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপে। রিয়াল মাদ্রিদের এই সুপারস্টার প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১.১৯২ মিলিয়ন পাউন্ড আয় করেন, যা দলের অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের তুলনায় অনেক বেশি।
পিএসজি ছেড়ে স্পেনের রাজধানীতে যোগ দেওয়ার পরও এমবাপের জনপ্রিয়তা ও বাজারমূল্য কমেনি। বরং তিনি বিশ্বের অন্যতম ব্র্যান্ডভ্যালুসম্পন্ন ফুটবলার হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন। বেতন, বোনাস এবং বিভিন্ন চুক্তি মিলিয়ে তার বার্ষিক আয় প্রায় ৬২ মিলিয়ন পাউন্ড।
মাদ্রিদে তার বিলাসবহুল বাসভবনও আলোচনার বিষয়। প্রায় ৯ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের এই ম্যানশনে রয়েছে আটটি শয়নকক্ষ, ১১টি বাথরুম, ছয়টি গাড়ির গ্যারেজ, ব্যক্তিগত সুইমিং পুল এবং আধুনিক সিনেমা হল।
উসমান দেম্বেলে: দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়কারী
ফ্রান্স দলের ধনীদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন উসমান দেম্বেলে। পিএসজির এই তারকা প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪৫৩ হাজার পাউন্ড আয় করেন।
একসময় ইনজুরির কারণে সমালোচনার মুখে পড়া দেম্বেলে বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম কার্যকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। গত কয়েক মৌসুমে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন বোনাসসহ তার বার্ষিক আয় ২৩.৫ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি।
থিও হার্নান্দেজের সৌদি অধ্যায়ে বড় আর্থিক লাভ
তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছেন থিও হার্নান্দেজ। ইউরোপীয় ফুটবলের গৌরবময় মঞ্চ ছেড়ে সৌদি আরবের ক্লাবে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাকে আর্থিকভাবে বিশাল সুবিধা এনে দিয়েছে।
এসি মিলানে সফল সময় কাটানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমানো এই লেফট-ব্যাক এখন বছরে ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি আয় করছেন। তার ভাই লুকাস হার্নান্দেজও তালিকার শীর্ষ পাঁচে অবস্থান করছেন।
জুলস কুন্দে ও উইলিয়াম সালিবার উত্থান
বার্সেলোনার ডিফেন্ডার জুলস কুন্দে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩২৫ হাজার পাউন্ড আয় করে তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। আর্থিক সংকটে থাকা বার্সেলোনার জন্য এই বেতন একটি বড় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অন্যদিকে, আর্সেনালের ডিফেন্সের স্তম্ভ উইলিয়াম সালিবা তালিকার ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন। নতুন চুক্তির মাধ্যমে তিনি বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ বেতনভোগী ডিফেন্ডারে পরিণত হয়েছেন। তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স আর্সেনালের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মাইকেল ওলিস, চুয়ামেনি ও নতুন প্রজন্মের তারকারা
বায়ার্ন মিউনিখের মাইকেল ওলিসও উচ্চ বেতনভোগীদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছেন। ক্রিস্টাল প্যালেস থেকে ইউরোপীয় জায়ান্ট ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর তার আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
রিয়াল মাদ্রিদের মিডফিল্ডার অরেলিয়েন চুয়ামেনিও সপ্তাহে ২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডের বেশি আয় করেন। ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই মিডফিল্ডারের ভবিষ্যৎ দলবদল হলে তার আয় আরও বাড়তে পারে।
এছাড়া ওয়ারেন জাইর-এমেরি এবং রায়ান চেরকির মতো তরুণ তারকারাও ইতোমধ্যে ফ্রান্স দলের সর্বোচ্চ আয়কারী খেলোয়াড়দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন।
অভিজ্ঞদের মধ্যে রাবিও, কোনাতে ও কান্তে
আদ্রিয়েন রাবিও এখনও ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম উচ্চ বেতনভোগী মিডফিল্ডার। বিভিন্ন ক্লাব পরিবর্তনের পরও তার চাহিদা কমেনি।
ইব্রাহিমা কোনাতে লিভারপুল ছেড়ে নতুন চুক্তির সন্ধানে রয়েছেন। বর্তমান আয় তার প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় তিনি আরও বড় বেতনের সুযোগ খুঁজছেন।
এদিকে এন’গোলো কান্তের বর্তমান বেতন তুলনামূলকভাবে কম মনে হলেও, সৌদি আরবের ফুটবল অধ্যায় শেষ করে নতুন গন্তব্যে যাওয়ার পর তার আর্থিক অবস্থান এখনও শক্তিশালী।

ফ্রান্স দলের শীর্ষ ২০ আয়কারীর তালিকায় কারা আছেন?
শীর্ষ আয়কারীদের মধ্যে আরও রয়েছেন লুকাস ডিগনে, ব্র্যাডলি বারকোলা, ডেজায়ার ডুয়ে, মাইক মাইনান, মার্কাস থুরাম এবং ব্রিস সাম্বা। এদের প্রত্যেকেই সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের বেতন পান এবং ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
বিশেষ করে ব্রিস সাম্বা শীর্ষ ২০ তালিকার শেষ খেলোয়াড়, যার সাপ্তাহিক আয় ১ লাখ পাউন্ডের কাছাকাছি।
তালিকার একেবারে নিচে রবিন রিসার
ফ্রান্স দলের সর্বনিম্ন বেতনভোগী খেলোয়াড় হিসেবে রয়েছেন গোলরক্ষক রবিন রিসার। তার সাপ্তাহিক আয় মাত্র ১২ হাজার পাউন্ড, যা এমবাপের এক সপ্তাহের আয়ের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ পাউন্ড কম।
বার্ষিক হিসেবে তিনি প্রায় ৬৩১ হাজার পাউন্ড আয় করেন। এই অঙ্ক এমবাপের মাত্র কয়েক দিনের আয়ের সমান। ফলে একই জাতীয় দলে খেললেও দুই ফুটবলারের আর্থিক ব্যবধান ফুটবল অর্থনীতির বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান স্কোয়াডগুলোর একটি
ফ্রান্স জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা সম্মিলিতভাবে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৬.৮ মিলিয়ন পাউন্ড আয় করেন। বার্ষিক আয়ের হিসাব ৩০০ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি।
এত বিপুল আর্থিক শক্তি এবং বিশ্বমানের প্রতিভার সমন্বয়ে গড়া এই দলকে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান ফেবারিট হিসেবে ধরা হচ্ছে। কাগজে-কলমে যেমন তারা শক্তিশালী, তেমনি আর্থিক দিক থেকেও বিশ্বের অন্যতম ধনী জাতীয় দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এই তারকারা যদি নিজেদের সামর্থ্যের পূর্ণ ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে ফ্রান্সের জন্য আরেকটি বিশ্বকাপ জয় মোটেও অসম্ভব নয়। মাঠের পারফরম্যান্স এবং অর্থনৈতিক শক্তি—দুই ক্ষেত্রেই তারা বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ সারির একটি দল।

