বাংলােদেশের অর্থনীতিকে গতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করতে ব্যবসায়ী এবং সরকারের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার ও বেসরকারি খাত যদি পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একসাথে কাজ করে, তাহলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই দেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে তিনি মনে করেন।
শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিভিন্ন দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত তথ্য জানান।
মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তিনি স্বীকার করেন যে বর্তমানে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে এসব সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা পেলে তা আরও দ্রুত সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, সরকার এককভাবে সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বেসরকারি খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকার ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা যেসব বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, সরকার সেগুলো গভীরভাবে বিবেচনায় নিচ্ছে। এসব বিষয়ে ধারাবাহিক আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং যৌথভাবে সমাধানের পথ বের করা হবে।
সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানা ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার যেমন এসব বিষয় উপলব্ধি করছে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন। তাই সংকট মোকাবিলায় উভয় পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছে। প্রথমে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা হয়েছে, পরে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন এবং ফোরামের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি শিল্পভিত্তিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, সরকারের বয়স এখনো ছয় মাস পূর্ণ হয়নি। এত অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে সমস্যা সমাধানে তারা আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
মতবিনিময় সভায় আগের বৈঠকের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, পূর্ববর্তী বৈঠকে ব্যবসায়ীরা যেসব সমস্যা তুলে ধরেছিলেন, তার অনেকগুলোরই ইতোমধ্যে সমাধান হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, আগের বৈঠকে মোট ২৮টি সমস্যা ও সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এর মধ্যে ২১টি বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট সাতটি বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং দ্রুত সেগুলোরও সমাধান করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বৈঠকেও ব্যবসায়ীরা নতুন কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। এসব বিষয়ও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই আবারও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, যত বেশি আলোচনা হবে, তত বেশি বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দ্রুত সমাধানের পথও তৈরি হবে।
প্রধানমন্ত্রীর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে জটিল সমস্যারও কার্যকর সমাধান বেরিয়ে আসে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের ধারাবাহিক সংলাপ অব্যাহত থাকলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।
বৈঠকে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নয়ন এবং নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। ব্যবসায়ীরা বলেন, শিল্পায়নের গতি বাড়াতে নীতিগত স্থিতিশীলতা, সহজ ঋণপ্রাপ্তি এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো প্রয়োজন।
তারা আরও উল্লেখ করেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, উৎপাদন বাড়বে এবং জাতীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
উদ্যোক্তারা সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তারা বিদ্যমান কিছু নীতিগত ও প্রশাসনিক সমস্যার দ্রুত সমাধানেরও আহ্বান জানান।
ব্যবসায়ী নেতারা সভায় শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তাদের মতে, উচ্চ সুদের হার এবং ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা অনেক উদ্যোক্তার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে করনীতি সহজীকরণ, দ্রুত সেবা প্রদান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
ব্যবসায়ীরা বলেন, সরকার যদি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ শক্তিশালী করতে পারলে দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বাড়বে।
সভায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং দ্রুত প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।
বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার একটি সম্ভাব্য রূপরেখা উপস্থাপন করেন।
তারা বলেন, রেডিমেট গার্মেন্টসের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তিতে এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতেও রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। পরিকল্পনা ঠিক করে ও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা পেলে এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব কিছুই নয় বলে তারা মনে করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং বিদ্যমান বাজার সম্প্রসারণে কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশের মিশনগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর বিষয়েও আশ্বাস দেওয়া হয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে সরকারের একাধিক মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং শীর্ষ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময় সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন এ্যাপেক্স গ্রুপের সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের আহসান খান চৌধুরী, মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামাল, ডিবিএল গ্রুপের এম এ জাব্বারসহ ইনসেপ্টা গ্রুপ, র্যাংকস গ্রুপ, প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপ, এসিআই, বে ফুটওয়্যার, রানার গ্রুপ, ওয়াল্টন গ্রুপ, যমুনা গ্রুপসহ বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সাম্প্রতিক এই বৈঠকও সেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ আরও উন্নত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতির গতিশীলতাও বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে।
আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আবারও সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা এই সংলাপকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ধারাবাহিক আলোচনা, নীতিগত সংস্কার এবং যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি আগামী বছরগুলোতে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে—এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীসহ সভায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী নেতারা।

