খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

ছাত্রীকে অশালীন মেসেজ: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চাকরিচ্যুত

ছাত্রীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন বার্তা পাঠানোর অভিযোগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলামকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে...
Homeআইন ও অপরাধছাত্রীকে অশালীন মেসেজ: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চাকরিচ্যুত

ছাত্রীকে অশালীন মেসেজ: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চাকরিচ্যুত

সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসে একের পর এক যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রশাসন বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। দীর্ঘ আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর ২৩৭তম সিন্ডিকেট সভায় অভিযুক্ত এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত

ছাত্রীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন বার্তা পাঠানোর অভিযোগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলামকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনসারের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যৌন হয়রানি নিরোধকেন্দ্রের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসে একের পর এক যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রশাসন বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। দীর্ঘ আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর ২৩৭তম সিন্ডিকেট সভায় অভিযুক্ত এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত এবং অন্য শিক্ষকের বিরুদ্ধে নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. এস এম মাহবুবুর রহমান সিন্ডিকেট সভা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, যৌন হয়রানি নিরোধকেন্দ্রের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ পর্যালোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনসারের বিষয়ে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধানের জন্য পৃথক একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এই কমিটি যৌন হয়রানি নিরোধকেন্দ্রের বিকল্প তদন্ত সংস্থা নয়। বরং প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন ছিল। সেই লক্ষ্যেই তদন্ত কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। যৌন হয়রানির অভিযোগে দুই শিক্ষকের বিচার এবং বিজয়’২৪ হলের ক্যানটিনকর্মীর বিরুদ্ধে ছাত্রীদের গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে শিক্ষার্থীরা কয়েকদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যান।

দাবি পূরণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় আন্দোলন আরও জোরদার হয়। আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস, পরীক্ষা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হতে শুরু করে।

পরে গত ২৩ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনের বিভিন্ন প্রবেশপথে তালা ঝুলিয়ে দেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ওই সময় শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের মূল দাবিগুলো বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠকে বসে। শিক্ষক প্রতিনিধিরাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আশ্বাস দেন।

পরবর্তীতে ২৫ জুলাই বিকেলে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক শেষে শিক্ষার্থীরা রাত ১০টার দিকে প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেন। তবে তারা স্পষ্ট করে জানান, দাবি বাস্তবায়নের আগে তারা নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় ফিরবেন না।

বৈঠকের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সুষ্ঠু তদন্ত এবং দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে শিক্ষার্থীরা সাময়িকভাবে ভবনের তালা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রশাসন অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেয়।

অন্যদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা পৃথক বিবৃতিতে জানান, শুধু আশ্বাসে তারা সন্তুষ্ট নন। বাস্তব পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, বিজয়’২৪ হলের ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানের বিরুদ্ধে গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসন এবং প্রভোস্ট বডির জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

এ ছাড়া যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. রুবেল আনসার এবং অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলামকে স্থায়ীভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের আরেকটি দাবি ছিল ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করা। তাদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।

গত ২২ জুলাই দিবাগত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়’২৪ হলে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার সূত্রপাত হয়। অভিযোগ ওঠে, হলের ছাত্রীদের শৌচাগার এবং গোসলখানার ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে গোপনে ভিডিও ধারণ করা হয়েছে।

ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানকে আটক করেন। পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে একই ঘটনায় তার স্ত্রীকেও গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

এর আগে গত ১৮ জুন অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে এক ছাত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেসেঞ্জারে অশালীন বার্তা পাঠানো এবং কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ করেন।

অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসেবে তাকে ডিসিপ্লিন প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। পরবর্তীতে বিষয়টি যৌন হয়রানি নিরোধকেন্দ্রে তদন্তের জন্য পাঠানো হয়।

তদন্তে অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করা হয়। সেই তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতেই সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় তাকে চাকরি থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় যে, যৌন হয়রানির মতো অভিযোগে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. রুবেল আনসারের বিরুদ্ধেও এর আগে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালের আগস্টে দুই শিক্ষার্থী তার বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন।

পরবর্তীতে একটি অভিযোগ থেকে তিনি অব্যাহতি পেলেও অন্য অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে দুই বছরের জন্য সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় তার বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধানের জন্য পাঁচ সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর শিক্ষার্থীরা বলছেন, শুধু একটি বা দুটি ঘটনায় ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারী শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ও নির্ভয়ে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন।

শিক্ষার্থীদের মতে, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে শক্তিশালী নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে হল, বিভাগ এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। চলমান তদন্তগুলো শেষ হওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযোগ প্রতিরোধে বিদ্যমান নীতিমালা আরও কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারসহ সংশ্লিষ্ট সবাই।