খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeমেডিকেল জার্নালটেস্টোস্টেরন থেরাপি কি টাইপ ২ ডায়াবিটিস সারাতে পারে? নতুন গবেষণায় মিলল গুরুত্বপূর্ণ...

টেস্টোস্টেরন থেরাপি কি টাইপ ২ ডায়াবিটিস সারাতে পারে? নতুন গবেষণায় মিলল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

গবেষণায় ৫০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী মোট ১,০০৭ জন পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই প্রি-ডায়াবিটিস অবস্থায় ছিলেন, অর্থাৎ তাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ ডায়াবিটিস ধরা পড়েনি। অনেকেরই অতিরিক্ত ওজন বা পেটের চর্বি ছিল।

টেস্টোস্টেরন থেরাপি ও টাইপ ২ ডায়াবিটিস: গবেষণা কী বলছে?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুরুষদের মধ্যে টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যবয়সী ও প্রবীণ পুরুষদের একটি বড় অংশ এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেকের বিশ্বাস, টেস্টোস্টেরন হরমোনের ঘাটতি পূরণ করলে শরীরে আবারও তারুণ্যের শক্তি ফিরে আসে, যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং এমনকি টাইপ ২ ডায়াবিটিসের মতো জটিল রোগও নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কিন্তু বাস্তবে কি বিষয়টি এতটাই সহজ?

সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করেছে এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এনেছে।

টেস্টোস্টেরন হরমোন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। এটি শুধু যৌনস্বাস্থ্য নয়, বরং শরীরের বিভিন্ন জৈবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুক্রাণু উৎপাদন, পেশির গঠন, হাড়ের শক্তি, শরীরের লোম বৃদ্ধি এবং যৌনইচ্ছা বজায় রাখতে এই হরমোন অপরিহার্য।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমতে শুরু করে। এর ফলে অনেক পুরুষ ক্লান্তি, পেশিশক্তি হ্রাস, মানসিক অবসাদ, যৌনইচ্ছা কমে যাওয়া এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হন। এসব সমস্যা মোকাবিলার জন্য অনেকেই টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির শরণাপন্ন হন।

টেস্টোস্টেরন থেরাপি নিয়ে প্রচলিত ধারণা

অনেকের ধারণা, টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন বা হরমোন থেরাপি গ্রহণ করলে শুধু যৌনস্বাস্থ্য নয়, বরং স্থূলতা ও টাইপ ২ ডায়াবিটিসের মতো জীবনধারাজনিত রোগও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এই বিশ্বাসের পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। টেস্টোস্টেরন হরমোন পেশির ভর বাড়াতে সাহায্য করে এবং কিছু ক্ষেত্রে শরীরের শক্তি ও উদ্যম বাড়াতে পারে। ফলে অনেকেই মনে করেন, এটি ডায়াবিটিস প্রতিরোধ বা নিরাময়েও কার্যকর হতে পারে।

তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান এই দাবিকে পুরোপুরি সমর্থন করে না।

গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?

শিকাগোতে অনুষ্ঠিত এন্ডোক্রিন সোসাইটির বার্ষিক সম্মেলনে গবেষকেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করেন। তাঁদের গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল টেস্টোস্টেরন থেরাপি টাইপ ২ ডায়াবিটিস প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর তা নির্ধারণ করা।

গবেষণায় ৫০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী মোট ১,০০৭ জন পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই প্রি-ডায়াবিটিস অবস্থায় ছিলেন, অর্থাৎ তাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ ডায়াবিটিস ধরা পড়েনি। অনেকেরই অতিরিক্ত ওজন বা পেটের চর্বি ছিল।

দুই বছর ধরে অংশগ্রহণকারীদের টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন দেওয়া হয় এবং তাঁদের স্বাস্থ্যগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, টেস্টোস্টেরন থেরাপি ডায়াবিটিস প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। যদিও কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে শক্তি বৃদ্ধি বা মানসিক সতেজতা অনুভূত হয়েছে, তবে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এর প্রভাব খুবই সীমিত ছিল।

জীবনযাত্রার পরিবর্তনেই মিলল সবচেয়ে ভালো ফল

গবেষণার পরবর্তী ধাপে ১২১ জন অংশগ্রহণকারীকে বিশেষ খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়ামের কর্মসূচির আওতায় আনা হয়।

এই পর্যায়ে গবেষকেরা বিস্ময়কর ফলাফল পান। নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ এবং শারীরিক অনুশীলনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায়। পাশাপাশি ওজনও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

এছাড়া তাঁদের বিপাকক্রিয়া উন্নত হয় এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিও কমতে দেখা যায়। অর্থাৎ, ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে হরমোন থেরাপির তুলনায় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

টেস্টোস্টেরন থেরাপির সীমাবদ্ধতা

অনেকেই মনে করেন, টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করলে বয়সজনিত সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

শুধু টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন নেওয়ার ফলে বয়স্ক ব্যক্তিদের পেশিশক্তি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায় না। একইভাবে যৌনইচ্ছা বা প্রজননক্ষমতার উন্নতিও সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়।

বরং অপ্রয়োজনীয়ভাবে হরমোন থেরাপি গ্রহণ করলে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ধরনের চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত নয়।

ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, টাইপ ২ ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো স্বাস্থ্যকর জীবনধারা।

এর মধ্যে রয়েছে:

  • সুষম ও নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস
  • নিয়মিত ব্যায়াম
  • ওজন নিয়ন্ত্রণ
  • পর্যাপ্ত ঘুম
  • মানসিক চাপ কমানো
  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা

রক্তে শর্করার মাত্রা মূলত খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কার্যকলাপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাই এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে না এনে শুধুমাত্র হরমোন ইনজেকশনের ওপর নির্ভর করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

টেস্টোস্টেরন থেরাপি নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে, বিশেষ করে যাঁদের শরীরে প্রকৃতপক্ষে টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি রয়েছে। তবে এটি টাইপ ২ ডায়াবিটিসের নিরাময় নয় এবং একে ডায়াবিটিস প্রতিরোধের কার্যকর উপায় হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না।

সাম্প্রতিক গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে, ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সবচেয়ে কার্যকর পথ। তাই দ্রুত ফলের আশায় শুধুমাত্র হরমোন থেরাপির ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত।