ভারতের অন্যতম ব্যস্ততম ও ঐতিহাসিক রেলস্টেশন হাওড়া স্টেশনকে আরও আধুনিক ও বিশ্বমানের পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন কয়েক লক্ষ যাত্রী এই স্টেশন ব্যবহার করেন। যাত্রীসুবিধা বাড়ানো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে এবার বিমানবন্দরের আদলে আন্তর্জাতিক মানের বাস ও ট্যাক্সি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এই প্রস্তাব রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের কাছে তুলে ধরেছেন উত্তর হাওড়ার বিধায়ক ও রাজ্যের রাষ্ট্রমন্ত্রী উমেশ রাই। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাওড়া স্টেশন চত্বরকে একটি সমন্বিত আধুনিক পরিবহন হাবে পরিণত করার লক্ষ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, গঙ্গার ঘাট এলাকা থেকে দীঘা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে একটি আন্তর্জাতিক মানের বাস ও ট্যাক্সি টার্মিনাল তৈরি করা হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে রেল এবং রাজ্য সরকার যৌথভাবে কাজ করতে পারে বলে আলোচনা হয়েছে।
পরিকল্পনার অন্যতম আকর্ষণ হলো যাত্রীদের জন্য আধুনিক সংযোগ ব্যবস্থা। হাওড়া স্টেশন থেকে বেরিয়েই যাত্রীরা চলন্ত সিঁড়ি এবং স্কাইওয়াক ব্যবহার করে সরাসরি বাসস্ট্যান্ড ও ট্যাক্সি টার্মিনালে পৌঁছাতে পারবেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যে ধরনের উন্নত যাত্রীসুবিধা দেখা যায়, সেই আদলেই এই অবকাঠামো নির্মাণের ভাবনা নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে হাওড়া স্টেশন থেকে বাস বা ট্যাক্সি ধরতে যাত্রীদের অনেক সময় ভিড়, যানজট এবং অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হতে হয়। নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যাত্রীদের চলাচল আরও সহজ, দ্রুত এবং নিরাপদ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কাইওয়াক এবং চলন্ত সিঁড়ির মাধ্যমে সরাসরি সংযোগ তৈরি হলে যাত্রীদের সময় বাঁচবে। একইসঙ্গে প্রবীণ নাগরিক, নারী ও শিশুদের যাতায়াতও অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে।
শুধু পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, হাওড়া স্টেশন চত্বরের সামগ্রিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় জমে থাকা নোংরা-আবর্জনা পরিষ্কার করে পুরো অঞ্চলকে ঝকঝকে ও আধুনিক রূপ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
হাওড়া শহর পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। তাই স্টেশন চত্বরের উন্নয়ন পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীদের কাছে শহরের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে সাহায্য করবে।
এই বিষয়ে উত্তর হাওড়ার বিধায়ক ও রাজ্যের মন্ত্রী উমেশ রাই জানিয়েছেন, হাওড়ার উন্নয়নে রেলমন্ত্রক ইতোমধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় তিনি রেলমন্ত্রীর কাছে আন্তর্জাতিক মানের বাস ও ট্যাক্সি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন।
উমেশ রাইয়ের দাবি, রেলমন্ত্রী তাঁর প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাওড়া দেশের অন্যতম আধুনিক পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
সম্প্রতি রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে নবান্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে রাজ্যের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকেই হাওড়ার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একাধিক প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
উমেশ রাইও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং হাওড়া শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বিশেষভাবে আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা, যাত্রীসুবিধা বৃদ্ধি এবং শহরের সৌন্দর্যায়নের ওপর জোর দেন।
গত কয়েক বছরে হাওড়ার উন্নয়নে রেলমন্ত্রক একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। বিভিন্ন এলাকায় আন্ডারপাস, রেলওভার ব্রিজ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এসব প্রকল্পের ফলে যানজট কমেছে এবং মানুষের যাতায়াত আরও সহজ হয়েছে।
রাজ্য সরকারের মতে, ভবিষ্যতেও হাওড়ার জন্য আরও উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। আন্তর্জাতিক মানের বাস ও ট্যাক্সি টার্মিনাল সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাওড়া স্টেশন শুধু একটি রেলস্টেশন হিসেবেই নয়, বরং রেল, বাস ও ট্যাক্সি পরিষেবার সমন্বয়ে একটি আধুনিক মাল্টি-মোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব হিসেবে গড়ে উঠবে।
যাত্রীসুবিধা, আধুনিক অবকাঠামো, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং উন্নত সংযোগ ব্যবস্থা একত্রে হাওড়াকে দেশের অন্যতম আধুনিক পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। ফলে প্রতিদিনের লাখো যাত্রীর অভিজ্ঞতা আরও উন্নত হবে এবং হাওড়া শহরের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বও নতুন মাত্রা পাবে।

