রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে স্বাস্থ্য বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সিআইডির বিশেষজ্ঞ সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
বুধবার (২৮ মে) হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তদন্ত কমিটিকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড এবং এনআইসিইউ’র কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একসঙ্গে ৬ শিশুর মৃত্যু শুধু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নয়, পুরো স্বাস্থ্যখাতকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। পরিবারগুলোর মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক। হাসপাতালের মতো নিরাপদ জায়গায় নবজাতকদের এমন মৃত্যু সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে কারিগরি ত্রুটির কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে হাসপাতালের ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম কিংবা অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা ছিল কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় তদন্ত কাজে যুক্ত হয়েছে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল। তারা হাসপাতালের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ সংযোগ, অক্সিজেন লাইন এবং এনআইসিইউ ইউনিটের কার্যক্রম বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে সুপারিশও দেওয়া হবে।
ঘটনার পর হাসপাতালের এনআইসিইউ এবং পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে নতুন রোগী ভর্তি কার্যক্রমও স্থগিত রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব ইউনিটে চিকিৎসা কার্যক্রম চালু করা হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবজাতকদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রতিটি যন্ত্র অত্যন্ত সংবেদনশীল। সামান্য ত্রুটিও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই তদন্তে প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই ঘটনার পর দেশের হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে এনআইসিইউ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে নিয়মিত মনিটরিং ও যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তদন্ত করলেই হবে না, হাসপাতালগুলোর প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অডিট ও কঠোর তদারকি প্রয়োজন। কারণ নবজাতকদের চিকিৎসা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়।
নিহত শিশুদের স্বজনরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানায়নি। অনেক পরিবার এখনো জানতে চায়, কী কারণে এতগুলো নবজাতকের মৃত্যু হলো।
একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা সন্তানকে সুস্থ করার জন্য হাসপাতালে এনেছিলাম। কিন্তু এখন সন্তানকেই হারিয়ে ফেললাম। এর দায় কেউ এড়াতে পারে না।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদি কারিগরি ত্রুটি বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দেশের স্বাস্থ্যখাতে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন সবার নজর তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে।

