ফুটবল বিশ্বকাপের মতো মহারণে প্রতিটি সিদ্ধান্তই থাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশেষ করে যখন মাঠে নামেন লিওনেল মেসির মতো বিশ্বসেরা তারকা, তখন তাঁর দলকে ঘিরে বিতর্কও যেন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার একাধিক ম্যাচে রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেই বিতর্কের আবহেই আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের বহুল প্রতীক্ষিত সেমিফাইনালের জন্য রেফারি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইসমাইল এলফাথকে দায়িত্ব দিয়েছে ফিফা। আর এই ঘোষণার পরই নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা ও সমালোচনা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের একাংশের দাবি, ইসমাইল এলফাথ নাকি লিওনেল মেসির ‘প্রিয় রেফারি’। পরিসংখ্যানও সেই দাবিকে আরও উসকে দিচ্ছে। কারণ, এলফাথের পরিচালনায় মেসি এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাচে হারেননি, এমনকি ড্রও করেননি। ফলে বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছেন অনেক ফুটবলপ্রেমী ও ইংল্যান্ড সমর্থকরা।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মানেই বাড়তি চাপ, আবেগ এবং প্রত্যাশার লড়াই। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড—দুই ফুটবল পরাশক্তির মুখোমুখি লড়াইকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। দুই দলেরই সমর্থকদের নজর এখন শুধু ফুটবলারদের পারফরম্যান্সে নয়, ম্যাচ পরিচালনার দিকেও।
ঠিক এমন সময়ে রেফারির নাম ঘোষণার পর বিতর্কের জন্ম হওয়াটা অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক নয়। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে নতুন এই নিয়োগকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইসমাইল এলফাথ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা ফুটবল রেফারিদের একজন। যদিও তিনি মার্কিন নাগরিক, তাঁর পারিবারিক শিকড় রয়েছে মরক্কোতে। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
২০১৬ সালে তিনি ফিফার স্বীকৃত আন্তর্জাতিক রেফারির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর থেকে একাধিক বড় টুর্নামেন্টে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে রয়েছে বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমস, ক্লাব বিশ্বকাপ এবং আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের মতো মর্যাদাপূর্ণ আসরের ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা।
চলতি বিশ্বকাপেও তিনি ইতোমধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তাঁর যোগ্যতা বা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ খুব একটা নেই বলেই মনে করেন ফুটবল বিশ্লেষকদের একাংশ।
ইসমাইল এলফাথকে ঘিরে বিতর্কের মূল কারণ তাঁর অধীনে লিওনেল মেসির দুর্দান্ত পরিসংখ্যান। এখন পর্যন্ত এলফাথের পরিচালনায় মেসি কোনো ম্যাচে হারেননি। শুধু তাই নয়, কোনো ম্যাচ ড্রও করেননি তিনি। অর্থাৎ শতভাগ জয়ের রেকর্ড রয়েছে আর্জেন্টাইন মহাতারকার।
আর এখানেই শেষ নয়। বর্তমানে মেসি যে মেজর লিগ সকারে খেলছেন, সেই প্রতিযোগিতার নিয়মিত রেফারিদের অন্যতম হলেন এলফাথ। তাঁর পরিচালনায় মেসির ক্লাব ইন্টার মায়ামিও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়েছে।
এই পরিসংখ্যান সামনে আসতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। অনেকেই তাঁকে মেসির ‘লাকি চার্ম’ বা সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করছেন।
বিশ্বকাপের সঙ্গে ইসমাইল এলফাথের সম্পর্ক নতুন নয়। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যদিও তিনি মূল রেফারি ছিলেন না, তবুও চতুর্থ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
সেই বিশ্বকাপেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিরোপা জিতেছিলেন লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এলফাথের নাম আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে তাঁর অভিজ্ঞতা থাকলেও এবার তাঁকে নিয়ে যতটা আলোচনা হচ্ছে, তার বড় কারণ মেসির সঙ্গে তাঁর পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক।
ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যেই ফিফার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এমন একজন রেফারিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যার অধীনে মেসির শতভাগ জয়ের রেকর্ড রয়েছে।
অবশ্য ফুটবলের বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, শুধুমাত্র পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কোনো রেফারির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়। একজন আন্তর্জাতিক রেফারি হিসেবে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং পেশাদারিত্বই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান বিষয়।
তবে সমর্থকদের আবেগের জায়গা থেকে এই আলোচনা যে আরও কিছুদিন চলবে, তা বলাই যায়।
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলিকে ঘিরে রেফারিং নিয়ে একাধিকবার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নকআউট পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
পেনাল্টির সিদ্ধান্ত, ফাউল নির্ধারণ এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর ব্যবহার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ সেই সিদ্ধান্তগুলিকে ফুটবলের প্রচলিত নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করেছেন, তবুও বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি।
ফলে নতুন করে ইসমাইল এলফাথের নাম ঘোষণার পর সেই পুরোনো বিতর্কও আবার সামনে চলে এসেছে।
বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা ফিফার অন্যতম বড় দায়িত্ব। রেফারি নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্ক তৈরি হলে তা প্রতিযোগিতার গ্রহণযোগ্যতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ফিফা সাধারণত রেফারিদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, পারফরম্যান্স এবং দক্ষতার ভিত্তিতেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের দায়িত্ব দিয়ে থাকে। সেই বিবেচনায় ইসমাইল এলফাথ নিঃসন্দেহে যোগ্য একজন রেফারি।
তবুও মেসির সঙ্গে তাঁর পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক এবং আর্জেন্টিনাকে ঘিরে চলমান বিতর্কের কারণে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে আলোচনা আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
আর্জেন্টিনা যেমন বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখছে, তেমনি ইংল্যান্ডও দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিরোপার আরও কাছে পৌঁছাতে চায়। ফলে সেমিফাইনালের চাপ শুধু ফুটবলারদের ওপরই নয়, রেফারির ওপরও সমানভাবে থাকবে।
ইসমাইল এলফাথের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবার কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজরে থাকবে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেমন নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে, তেমনি নির্ভুল ম্যাচ পরিচালনা তাঁর পেশাদারিত্বের আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালকে ঘিরে উত্তেজনার পারদ ইতোমধ্যেই চরমে পৌঁছেছে। তার মধ্যেই ইসমাইল এলফাথকে রেফারি হিসেবে নিয়োগ নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মেসির শতভাগ জয়ের রেকর্ড, তাঁর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং চলতি বিশ্বকাপের রেফারিং বিতর্ক—সব মিলিয়ে ম্যাচটির গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।
তবে শেষ পর্যন্ত ফুটবল মাঠেই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে। রেফারির পরিচয় নয়, দুই দলের পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করবে কে পৌঁছাবে বিশ্বকাপের মহারণে। আর সেই লড়াই দেখার অপেক্ষায় এখন গোটা ফুটবল বিশ্ব।

