বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হৃদয়ভাঙা হারের পর দীর্ঘ ছয় দিন জনসমক্ষে দেখা যায়নি লিওনেল মেসিকে। সেই নীরবতার অবসান ঘটল শনিবার। আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে নিজের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর ফাঁকে ছেলেকে নিয়ে স্থানীয় একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে হাজির হন বিশ্বজোড়া জনপ্রিয় এই তারকা। কিন্তু মেসির এই সাধারণ উপস্থিতির চেয়েও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তাঁর জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ। কারণ, একই দিনে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস এমন একটি মন্তব্য করেছেন, যা মেসির অবসর নিয়ে নতুন করে জল্পনা উস্কে দিয়েছে।
বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজয়ের পর নিজেকে অনেকটাই আড়ালে রেখেছিলেন লিওনেল মেসি। ইন্টার মায়ামির প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিগত সময় কাটাচ্ছেন। এই সময়ের মধ্যেই শনিবার রোসারিওর বাড়ির কাছের একটি স্টেডিয়ামে স্থানীয় ক্লাব লিওনেস এফসির ম্যাচ দেখতে যান তিনি।
মেসি যাতে সহজে কারও নজরে না পড়েন, সে জন্য মাথায় হুডি ও টুপি পরে গ্যালারির একটি বিশেষ অংশে বসে খেলা উপভোগ করছিলেন। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের চোখ এড়ানো সহজ ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শকেরা তাঁকে চিনে ফেলেন এবং স্টেডিয়ামজুড়ে ধ্বনিত হতে থাকে, “মেসি… মেসি…”। সমর্থকদের সেই ভালোবাসার জবাবে হাসিমুখে হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানান আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মেসি তাঁর ছেলেকে নিয়ে হেঁটেই স্টেডিয়ামে পৌঁছেছিলেন। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকাকে এত সাধারণভাবে মানুষের মাঝে দেখা অনেক সমর্থকের কাছেই ছিল বিশেষ এক মুহূর্ত।
বিশ্বকাপের হতাশা কাটিয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং ফুটবল থেকে পুরোপুরি দূরে না থাকা— দুই দিকই এই সফরে স্পষ্ট হয়েছে।
যে ক্লাবের ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন মেসি, সেই লিওনেস এফসি তাঁর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটির চেয়ারম্যান মেসির ভাই মাতিয়াস মেসি। বর্তমানে ক্লাবটি আর্জেন্টিনার চতুর্থ বিভাগের লিগে খেলছে।
শুধু পারিবারিক সম্পর্ক নয়, ক্লাব পরিচালনার বিভিন্ন সিদ্ধান্তেও মেসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে জানা যায়। তাই সুযোগ পেলেই তিনি ক্লাবটির খোঁজখবর রাখেন এবং সময় পেলে মাঠে গিয়ে খেলা উপভোগ করেন।
এবারের বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি আটটি গোল করেছেন এবং সতীর্থদের দিয়ে আরও চারটি গোল করিয়েছেন।
তবে ব্যক্তিগত সাফল্য সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে হেরে শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। সেই পরাজয়ের হতাশা এখনও কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন মেসি ও তাঁর সতীর্থরা।
শনিবারই এক সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস এমন মন্তব্য করেন, যা ফুটবল বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
পারেদেসের ধারণা, বিশ্বকাপের ফাইনালই হয়তো জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ ছিল।
তিনি বলেন, “আমার মনে হচ্ছে মেসি হয়তো নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। সম্ভবত জাতীয় দলের হয়ে ওর শেষ ম্যাচ হয়ে গেছে। আমি চাই, এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হোক। আমরা সবাই চাই আরও কিছুদিন ওর সঙ্গে খেলতে। তবে শেষ সিদ্ধান্ত একমাত্র মেসিরই। ও যেটা ঠিক মনে করবে, আমরা সেটাকেই সম্মান জানাব।”
পারেদেস আরও বলেন, মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি পুরো দলের অনুপ্রেরণা।
তাঁর ভাষায়, “মেসিকে ছাড়া জাতীয় দলকে কল্পনা করাও কঠিন। আমরা সবাই চাই, আরও কিছু ম্যাচ ও আমাদের সঙ্গে খেলুক। তবে ওর সুখই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
এই মন্তব্যের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। অনেক সমর্থক মনে করছেন, পারেদেস হয়তো এমন কিছু জানেন, যা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
পারেদেস জানান, বিশ্বকাপ চলাকালীন দলের ভেতরে সবাই একটাই প্রার্থনা করছিলেন— যেন “শেষ ম্যাচ” কথাটা কখনও না আসে।
তিনি বলেন, “আমরা কেউই ভাবতে চাইনি যে একটা সময় শেষ ম্যাচ এসে যাবে। মেসির মতো কিংবদন্তির বিদায় এভাবে হতে পারে না।”
এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, মেসির সম্ভাব্য বিদায় নিয়ে আর্জেন্টিনা শিবিরেও আবেগ কাজ করছে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের পর আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে দেশে ফেরেননি মেসি। ব্যক্তিগত কিছু কাজের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই থেকে যান। এরপর দুই দিন পর একাই আর্জেন্টিনায় ফেরেন।
তাঁর দেশে ফেরার খবরও গোপন রাখা হয়েছিল, যাতে বিমানবন্দর বা বাসভবনের সামনে অতিরিক্ত ভিড় না হয়। পরিবারের সঙ্গে নিরিবিলি সময় কাটানোর সুযোগ করে দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
লিওনেল মেসি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেননি। ফলে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে পারেদেসের মন্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যদি সত্যিই বিশ্বকাপ ফাইনালই আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ ম্যাচ হয়ে থাকে, তাহলে সেটি হবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। আর যদি তিনি আরও কিছুদিন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলেন, তবে সেটি হবে কোটি কোটি সমর্থকের জন্য দারুণ সুখবর।
এখন পুরো ফুটবল বিশ্বের নজর একটাই প্রশ্নে— লিওনেল মেসি কি আবারও আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে মাঠে নামবেন, নাকি বিশ্বকাপ ফাইনালই হয়ে থাকবে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়?

