মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে আরও জটিল রূপ নিয়েছে। জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগের পর এবার ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, এটি ছিল সাম্প্রতিক হামলার সরাসরি জবাব এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলা ঠেকানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত সামরিক অভিযান।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এই অভিযানে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। হামলার আওতায় ছিল সামরিক কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সংরক্ষণ কেন্দ্র, ড্রোন তৈরির কারখানা, উপকূলীয় নজরদারি অবকাঠামো এবং নৌবাহিনীর একাধিক ঘাঁটি।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত প্রায় ৮টার দিকে অভিযান শুরু হয় এবং প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একাধিক ধাপে বিমান হামলা চলে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অত্যন্ত নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্বাচন করা হয়েছিল, যাতে সামরিক স্থাপনাগুলোকে আঘাত করা যায় এবং বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কম রাখা যায়।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর বার্তা দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলার চেষ্টা করলে তার কঠিন জবাব দেওয়া হবে। ট্রাম্পের ভাষায়, এবার পাল্টা আঘাত হানার সময় এসেছে এবং ইরানও জানত যে এমন একটি প্রতিক্রিয়া আসতে পারে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে উত্তেজনা তৈরির ঘটনাকে তারা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাই দ্রুত সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।
ওয়াশিংটনের দাবি, এই অভিযান কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলা প্রতিরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার বার্তা দেওয়ার লক্ষ্যেই এটি পরিচালিত হয়েছে।
এর আগে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছিল, তারা জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটি ও কমান্ড সেন্টারকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা জানায়, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অমান্য করে চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারের বিরুদ্ধেও তাদের নৌবাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছে।
তবে মার্কিন সেন্টকম সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান থেকে ছোড়া সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিরোধ করা হয়েছে। উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশেই ধ্বংস করা হয় এবং কোনো মার্কিন ঘাঁটি বা সেনা সদস্যের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
এই পাল্টাপাল্টি দাবির কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কারণ দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।
বর্তমান উত্তেজনা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ধীরে ধীরে এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এই সংঘাতের কারণে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র সংগঠন পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)-এর বিভিন্ন অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। সংগঠনটির দাবি, ওই হামলায় অন্তত ২০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরাক সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বাগদাদের মতে, তাদের ভূখণ্ডে অনুমতি ছাড়া বিদেশি সামরিক অভিযান পরিচালনা করা দেশের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, অভিযানের আগে ইরাক সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিল।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা শুরু করে। সে সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, এই সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে। পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংঘর্ষ বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিটি নতুন হামলার পর পাল্টা হামলা সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করে তুলছে।
এই সংঘাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা হিসেবে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত এই সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যায়।
যদি এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায় কিংবা জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক উদ্যোগ থেমে নেই। বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুবরাজ খালিদ বিন সালমান সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং উত্তেজনা কমানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সৌদি আরব কয়েক দিনের যুদ্ধবিরতি এবং অনানুষ্ঠানিক সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর সেই প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিশোধমূলক সামরিক অভিযানের এই ধারা অব্যাহত থাকলে পুরো অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো ছোট ভুল হিসাব বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তাও বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর ইরান কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে এক পক্ষের সামরিক অভিযানের পর অপর পক্ষ সাধারণত পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। ফলে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
একই সময়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগও চলমান রয়েছে। অনেক দেশই চাইছে, যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান হোক। তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক উত্তেজনা এখনও সমান্তরালভাবেই এগিয়ে চলেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌপথের সুরক্ষা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার সবকিছুই এই সংঘাতের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করছে। তাই বিশ্বের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই আগামী দিনের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
তথ্য সূত্র : বিবিসি।

