বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে বাস্তব ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে বহু রাষ্ট্রপতি নানা কারণে সেই পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। কেউ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পদত্যাগ করেছেন, কেউ সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, আবার কেউ হত্যাকাণ্ড বা মৃত্যুর কারণে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ পাননি। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদ বহুবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সংবিধান রাষ্ট্রপতির জন্য পাঁচ বছরের মেয়াদ নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সামরিক হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক সংকট, গণঅভ্যুত্থান, পদত্যাগ কিংবা মৃত্যুর মতো ঘটনায় অনেক রাষ্ট্রপতির দায়িত্বকাল অসমাপ্ত থেকে গেছে।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। তার সাংবিধানিক মেয়াদের এখনও প্রায় এক বছর নয় মাস বাকি ছিল।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তিনি রাষ্ট্রপতির পদে বহাল ছিলেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। পরে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলেও তিনি দায়িত্বে বহাল ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের মাধ্যমে তার মেয়াদও অসমাপ্ত থেকে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। স্বাধীনতার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। পরে ১৯৭৫ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হলে তিনি আবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
কিন্তু বাকশাল ব্যবস্থা চালুর মাত্র সাত মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একদল সদস্য তাকে সপরিবারে হত্যা করে। ফলে তার রাষ্ট্রপতির মেয়াদও পূর্ণ হয়নি।
বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতিদের একজন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী দায়িত্ব পালনকালে নিজেকে কার্যত উপেক্ষিত মনে করতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকায় তিনি ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর স্পিকার মুহম্মদুল্লাহ রাষ্ট্রপতি হন। তবে মাত্র এক বছরের মধ্যেই দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হওয়ায় তার দায়িত্বের অবসান ঘটে।
শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। কিন্তু মাত্র ৮১ দিন পর সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ফলে তার রাষ্ট্রপতিত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে রয়েছে।
১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও প্রকৃত ক্ষমতা ছিল সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাতে। পরে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেও নিজের স্মৃতিকথায় তিনি উল্লেখ করেন, সেনাপ্রধানের চাপেই তাকে পদ ছাড়তে হয়েছিল।
১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও রাষ্ট্রপতি হন জিয়াউর রহমান। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হওয়ায় তার মেয়াদও পূর্ণ হয়নি।
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং পরে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত বেসামরিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সামরিক অভ্যুত্থানের শিকার হন।
সামরিক শাসনের সময় রাষ্ট্রপতি হলেও আহসান উদ্দীন চৌধুরীর হাতে কার্যত কোনো ক্ষমতা ছিল না। প্রায় ২০ মাস পর এরশাদ তাকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতা দখলের পর নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হন এরশাদ। তবে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ফলে তার সাংবিধানিক মেয়াদও অসমাপ্ত থেকে যায়।
২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাস পরই বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া জিল্লুর রহমানের পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০১৪ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৩ সালের মার্চে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হলে তিনি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। পরে আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং পরে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন।
সব রাষ্ট্রপতির ভাগ্যে অসমাপ্ত মেয়াদ জোটেনি। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং আবদুল হামিদের মতো কয়েকজন রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে সফলভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে আবদুল হামিদ টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাস কেবল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার গল্প নয়, বরং এটি দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনেরও প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতার পর বহু রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক সংঘাত, সামরিক শাসন, গণঅভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।
সর্বশেষ মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ সেই দীর্ঘ ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে। এটি আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ অনেক সময় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক হলেও দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা এই পদকে বারবার নতুন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।

