জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান সাফল্য আসেনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বহুল আলোচিত এই প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও সফর শেষে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার মতো কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যায়নি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন প্রশ্নে সরকার বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করছে। তার মতে, এ অঞ্চলের অধিকাংশ সংসদ সদস্য বিরোধী দলের হওয়ায় বাজেট বরাদ্দ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে উত্তরাঞ্চল ধারাবাহিকভাবে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিকেলে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জাতীয় কৃষক শক্তির উদ্যোগে আয়োজিত এক কৃষক সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। সমাবেশে দেশের কৃষি, কৃষকের অধিকার এবং উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়।
এ সময় তিনি বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই এ বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আবু সাঈদ বুক পেতে গুলি গ্রহণের মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানের সূচনার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন কৃষক পরিবারের সন্তান।
নাহিদের মতে, দেশের বিভিন্ন আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে যারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন কিংবা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশই কৃষক পরিবারের সন্তান। এ কারণে কৃষকদের অবদান শুধু খাদ্য উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সমাবেশে কৃষকদের অর্থনৈতিক সংকট নিয়েও কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ফসল সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষকরা তাদের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না।
তার ভাষায়, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য নিশ্চিত না হলে দেশের কৃষি খাত আরও সংকটে পড়বে। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তিনি কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর নীতি গ্রহণ এবং সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
নাহিদ ইসলাম বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি উপেক্ষা করা হচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সেচ ব্যবস্থা, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এ অঞ্চল এখনও পিছিয়ে রয়েছে। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে সমগ্র দেশের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
সমাবেশে বক্তারা কৃষকদের সামনে থাকা নানা সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। তারা বলেন, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সহজলভ্য সেচ সুবিধা, সময়মতো সার ও উন্নতমানের বীজ সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যয় কমানো এখন সময়ের দাবি।
বক্তাদের মতে, কৃষি খাতকে টেকসই করতে হলে কৃষকদের প্রতি আরও বেশি সহায়তা ও প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
কৃষক সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আতিক মুজাহিদ, কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মুকুল মিয়া, নারী শক্তির আহ্বায়ক নাসিরা খন্দকার নিসাসহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক নেতা।
তারা সবাই কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, কৃষি খাতের উন্নয়ন এবং উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সমাবেশে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য এবং উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্যের বিষয়গুলো আবারও আলোচনায় উঠে আসে। বক্তারা মনে করেন, দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে কৃষকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং তিস্তা অববাহিকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
একই সঙ্গে তারা সরকারকে কৃষি, সেচ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান। এতে শুধু উত্তরাঞ্চল নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তাও আরও শক্তিশালী হবে।

