ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) চালুর পর থেকেই ফুটবল বিশ্বে বিতর্কের শেষ নেই। কারও মতে এটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর প্রযুক্তি, আবার অনেকের অভিযোগ, ভিএআর অনেক সময় ম্যাচের স্বাভাবিক গতি নষ্ট করার পাশাপাশি বিতর্কও বাড়িয়ে দেয়। চলমান বিশ্বকাপেও সেই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা এবং লিওনেল মেসিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
অনেক সমর্থকের দাবি, আর্জেন্টিনাকে পরিকল্পিতভাবে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ আবার বলছেন, শিরোপা জেতানোর উদ্দেশ্যেই ম্যাচে ম্যাচে ভিএআর তাদের পক্ষে কাজ করছে। তবে আবেগের বাইরে গিয়ে যখন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা হয়, তখন ভিন্ন একটি চিত্র উঠে আসে।
ভিএআরের মূল লক্ষ্য হলো ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আরও নির্ভুল করা। গোল, পেনাল্টি, লাল কার্ড কিংবা ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার মতো ঘটনায় প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে রেফারি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি সিদ্ধান্ত সমর্থকদের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয় না। একটি দলের পক্ষে সিদ্ধান্ত গেলেই প্রতিপক্ষের সমর্থকদের অভিযোগ শুরু হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক সাফল্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “ভিএআর আর্জেন্টিনার পক্ষে কাজ করছে”— এমন অভিযোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বিতর্ক যতই বাড়ুক, তথ্য-উপাত্ত কিন্তু অন্য কথা বলছে।
গ্রুপ পর্ব থেকে শেষ ষোলো পর্যন্ত বিভিন্ন ম্যাচের ভিএআর হস্তক্ষেপ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি ১০০টি ফাউলে ভিএআরের সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক হস্তক্ষেপ হয়েছে আয়োজক দেশ মেক্সিকোর পক্ষে। তাদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৭.৮।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে, যেখানে প্রতি ১০০টি ফাউলে ভিএআরের হস্তক্ষেপের হার ৬.৭।
এরপর তালিকায় রয়েছে—
- পর্তুগাল – ৪.৬
- নিউজিল্যান্ড – ৪.২
- সৌদি আরব – ৩.৬
এই পরিসংখ্যান দেখায় যে, ভিএআরের সুবিধা পাওয়ার তালিকায় আর্জেন্টিনা শীর্ষে নয়। ফলে শুধুমাত্র সংখ্যার বিচারে আর্জেন্টিনাকে সবচেয়ে বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত দল বলা কঠিন।
এই টুর্নামেন্টের একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, গ্রুপ পর্ব থেকে শেষ ষোলো পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কোনো ভিএআর সিদ্ধান্ত যায়নি।
এই তথ্যই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি কেবল কাকতালীয় নয়। তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, কোনো দলের বিপক্ষে ভিএআর সিদ্ধান্ত না যাওয়া মানেই পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ নয়। কারণ প্রতিটি ম্যাচের পরিস্থিতি ভিন্ন এবং ভিএআর শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ঘটনায় হস্তক্ষেপ করে।
যেখানে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ উঠছে, সেখানে পরিসংখ্যান বলছে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ক্রোয়েশিয়ার ওপর।
২০১৮ সালের রানার্সআপ দলটি টুর্নামেন্টে ভিএআরের কোনো ইতিবাচক সুবিধাই পায়নি। বরং তাদের বিপক্ষে প্রতি ১০০টি ফাউলে ৬.৫ বার ভিএআর হস্তক্ষেপ হয়েছে।
এই তালিকায় এরপর রয়েছে—
- ইরান – ৫.৪
- কাতার – ৫.১
- জার্মানি – ৪.০
- ইংল্যান্ড – ৩.৫
এই তথ্য প্রমাণ করে যে ভিএআর নিয়ে বিতর্ক শুধু আর্জেন্টিনাকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দলই নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত মনে করছে।
শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে হারের পর মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান প্রকাশ্যে রেফারিংয়ের তীব্র সমালোচনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে এবং ম্যাচে তারা সুবিচার পাননি। তাঁর ভাষায়, দলটি প্রতারণার শিকার হয়েছে এবং এমন সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পরবর্তীতে মিশর ফুটবল সংস্থাও ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। যদিও ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইগি কোলিনা অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দেন।
তিনি স্পষ্টভাবে জানান, রেফারিদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো “মিস্টেকেন আইডেন্টিটি” নিয়ম আলোচনায় আসে। এই নিয়মের আওতায় সুইজারল্যান্ডের ফরোয়ার্ড ব্রিল এম্বোলো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে লাল কার্ড পান।
৭১ মিনিটের সেই সিদ্ধান্তে সুইস শিবির তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে।
ম্যাচ শেষে সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন বলেন, সিদ্ধান্তটি বোঝা কঠিন এবং এমন রায় ম্যাচের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তাঁর মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার সঠিক হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও ধারাবাহিকতা থাকা জরুরি।
আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি বড় কারণ ছিল আলজেরিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসির একটি স্টাডস-আপ ট্যাকল।
ঘটনার পর অনেক সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকের দাবি ছিল, ওই ট্যাকলের জন্য মেসিকে অন্তত হলুদ, এমনকি সরাসরি লাল কার্ডও দেখানো যেতে পারত। কিন্তু রেফারি কোনো কার্ডই দেখাননি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, অন্য কোনো খেলোয়াড় হলে কি একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো?
ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল করার উদ্দেশ্যে চালু হলেও, বিতর্ক যেন কমার বদলে আরও বেড়েছে। আর্জেন্টিনাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পেছনে কিছু প্রশ্ন অবশ্যই রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত পরিসংখ্যান সরাসরি প্রমাণ করে না যে শুধুমাত্র আর্জেন্টিনাকেই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
বরং তথ্য বলছে, বিভিন্ন দল ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচে ভিএআরের সিদ্ধান্তে লাভবান কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই আবেগ নয়, নিরপেক্ষ বিশ্লেষণই এই বিতর্ক মূল্যায়নের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে, ভিএআরকে ঘিরে আলোচনা ও সমালোচনাও তত বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি নয়, বরং তার সঠিক ও ধারাবাহিক ব্যবহারই নির্ধারণ করবে ফুটবল সমর্থকদের আস্থা কতটা অর্জন করা সম্ভব।

