কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় এক ভয়াবহ ও অপ্রত্যাশিত হামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার পরিবারের সদস্যরা। এই ঘটনাটি শুধু একটি পারিবারিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলে তীব্র উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। সোমবার (১ জুন) আছরের নামাজের পর জীবননগর উপজেলার হাসাদাহ বাজারে ঘটে যাওয়া এই হামলা মুহূর্তেই স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্যরা কুষ্টিয়া থেকে দুটি আলাদা গাড়িতে করে জীবননগরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। একটি বিশেষ গাড়িতে ছিলেন এমপি নিজে, আরেকটি মাইক্রোবাসে ছিলেন তার স্ত্রী, শ্যালক এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল, কিন্তু হাসাদাহ বাজারে পৌঁছানোর পর হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে যায়।
মাইক্রোবাসটির সামনে একটি অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক এসে দাঁড়ায় এবং রাস্তা আটকে দেয়। চালক বারবার হর্ন দিলেও ইজিবাইকটি সরে না। তখন গাড়ির চালক সাদ্দাম হোসেন নিচে নেমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। প্রথমে মনে হয়েছিল বিষয়টি সহজেই মিটে যাবে, কারণ ইজিবাইক চালক নিজের ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নেয়।
হঠাৎ করেই স্থানীয় এক ব্যক্তি মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক এবং তার দুই ছেলে শাহরিয়ার ও রিমন ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয়। তারা কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই গাড়ির চালকের ওপর হামলা শুরু করে। পরিস্থিতি দেখে আবু বক্কর, যিনি একজন সাংবাদিক এবং এমপির শ্যালক, গাড়ি থেকে নেমে নিজের পরিচয় দেন।
কিন্তু পরিচয় দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। হামলাকারীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে আবু বক্করের মুখ ও চোখ লক্ষ্য করে একের পর এক আঘাত করতে থাকে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। শুধু তাই নয়, এমপির স্ত্রী যখন ভাইকে বাঁচাতে গাড়ি থেকে নামেন, তখন তাকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
এই হামলায় চালক সাদ্দাম হোসেন এবং সাংবাদিক আবু বক্কর দুজনই গুরুতরভাবে আহত হন। তাদের দ্রুত উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুরো ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত দ্রুত এবং সহিংস। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বাজারে উপস্থিত সাধারণ মানুষ প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়েন, পরে কেউ কেউ এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “আমরা ভাবতেই পারিনি এমন কিছু ঘটতে পারে। রাস্তার ছোটখাটো বিষয় নিয়ে এত বড় হামলা—এটা সত্যিই ভয়ংকর।”
একজন সংসদ সদস্যের পরিবারের ওপর প্রকাশ্যে এমন হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় আলোচনা, সমালোচনা এবং দোষারোপের পালা। অনেকেই এটিকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হিসেবে দেখছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ঘটনাটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত বিচার দাবি করছেন। অনেকেই বলছেন, যদি একজন এমপির পরিবারের সদস্যরাও নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান সেখের নেতৃত্বে একাধিক পুলিশ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। পুলিশ উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্তরা এলাকা থেকে পালিয়ে যায়।
পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আহতদের উদ্ধার করে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বর্তমানে সংসদ সদস্য ও তার পরিবারের সদস্যরা থানায় অবস্থান করছেন, যেখানে তাদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ওসি সোলায়মান সেখ জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক টিম ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছে।
তিনি বলেন, “আমরা ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে দেখছি। যারা এই হামলার সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”
এই ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মহাসড়কে এমন একটি ঘটনা ঘটায় অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাস্তার শৃঙ্খলা, যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। ছোট একটি ভুল বোঝাবুঝি কীভাবে বড় সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, এই ঘটনাটি তার একটি উদাহরণ।

