কিডনি মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। রক্ত পরিশোধন, শরীরের অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য বের করে দেওয়া এবং বিভিন্ন খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে এই অঙ্গ। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, কিডনির রোগ অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে। ফলে রোগ ধরা পড়ার আগেই কিডনির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মানুষ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও এবং প্রস্রাবের কোনো সমস্যা না থাকলেও ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা হারাতে পারেন। তাই কিডনি সুস্থ রাখতে সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
কেন কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’?
কিডনির রোগের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উপসর্গ তৈরি করে না। বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাব বা মূত্রনালির সংক্রমণ হলেই কিডনির সমস্যা রয়েছে। বাস্তবে বিষয়টি সব সময় এমন নয়।
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কিডনির কার্যক্ষমতা ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার পর প্রথমবার রোগ ধরা পড়ে। তখন চিকিৎসার পথও জটিল হয়ে যায়। অনেককে ডায়ালিসিসের ওপর নির্ভর করতে হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে কিডনি প্রতিস্থাপনই একমাত্র সমাধান হয়ে দাঁড়ায়।
এই কারণেই চিকিৎসকেরা বারবার জোর দিচ্ছেন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর।
কিডনি সুস্থ রাখতে খাদ্যাভ্যাসে আনুন পরিবর্তন
সঠিক খাদ্যাভ্যাস কিডনি রক্ষার অন্যতম প্রধান উপায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য তালিকায় এমন খাবার রাখতে হবে যা শরীরে কম টক্সিন ও বর্জ্য উৎপন্ন করে।
অতিরিক্ত নুন খাওয়া কমান
খাবারে অতিরিক্ত লবণ বা কাঁচা নুন কিডনির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। নিয়মিত বেশি নুন খেলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে, যা কিডনি ক্ষতির অন্যতম কারণ।
তাই অতিরিক্ত ঝাল-মশলাযুক্ত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং বেশি লবণযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।
কিডনির জন্য উপকারী খাবার
কিছু খাবার কিডনির জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি উপকারী বলে মনে করা হয়। যেমন—
• বেদানা
• কালো আঙুর
• অলিভ অয়েল
• বাঁধাকপি
• ডিমের সাদা অংশ
এ ছাড়া পরিশোধিত শস্যের পরিবর্তে ডালিয়া, কিনোয়া এবং গ্লুটেন-মুক্ত শস্য খাওয়া যেতে পারে। এসব খাবার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে এবং কিডনির ওপর চাপ তুলনামূলক কম ফেলে।
প্রোটিন খেতে হবে পরিমিত মাত্রায়
প্রোটিন শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও কিডনির রোগীদের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, দিনে মাছ বা মাংস খেলে রাতের খাবারে অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ না করাই ভালো। একইভাবে ডাল, দুধ ও পনিরও অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া উচিত নয়।
বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই কিডনির সমস্যা, ডায়াবিটিস বা হৃদ্রোগ রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রোটিন গ্রহণ করা প্রয়োজন।
পটাশিয়াম ও সোডিয়ামের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি
কিডনি শরীরের সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই খনিজগুলোর মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করলে শুধু কিডনিই নয়, হৃদ্যন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যাঁদের রক্তে সোডিয়াম বা পটাশিয়ামের মাত্রা প্রায়ই পরিবর্তিত হয়, তাঁদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে কিডনি রোগ এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
কিডনির রোগ শনাক্তে প্রয়োজন নিয়মিত পরীক্ষা
কিডনির রোগ যেহেতু অনেক সময় উপসর্গ ছাড়াই এগোয়, তাই নিয়মিত কিছু পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি আরও জরুরি।
ব্লাড ইউরিয়া নাইট্রোজেন (BUN) পরীক্ষা
ব্লাড ইউরিয়া নাইট্রোজেন বা BUN টেস্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ত পরীক্ষা। এতে রক্তে ইউরিয়া নাইট্রোজেনের মাত্রা পরিমাপ করা হয়।
ইউরিয়া নাইট্রোজেন হলো প্রোটিন বিপাকের ফলে তৈরি হওয়া বর্জ্য পদার্থ। সুস্থ কিডনি এই বর্জ্য রক্ত থেকে ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়।
যদি পরীক্ষায় ইউরিয়া নাইট্রোজেনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পাওয়া যায়, তাহলে তা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।
সাধারণত এই পরীক্ষার খরচ ২০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে, যদিও ল্যাবভেদে তা পরিবর্তিত হতে পারে।
কিডনি আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা রেনাল আলট্রাসাউন্ড
ডায়াবিটিস, হৃদ্রোগ বা দীর্ঘমেয়াদি অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের জন্য রেনাল আলট্রাসাউন্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এই পরীক্ষায় শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে কিডনির আকার, আকৃতি ও অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি কিডনিতে পাথর, সিস্ট, টিউমার বা অন্যান্য অস্বাভাবিকতা রয়েছে কি না, তাও শনাক্ত করা সম্ভব।
রেনাল আলট্রাসাউন্ডের খরচ সাধারণত ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে, যা হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারভেদে ভিন্ন হয়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
কিছু মানুষের কিডনি রোগ হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি। যেমন—
• ডায়াবিটিস রোগী
• উচ্চ রক্তচাপের রোগী
• হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
• স্থূলতায় ভোগা মানুষ
• ধূমপায়ী
• পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তি
এই ব্যক্তিদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
কিডনি সুস্থ রাখতে প্রতিদিন কী করবেন?
কিডনি ভালো রাখতে কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চললেই অনেকটা সুরক্ষা পাওয়া যায়।
• পর্যাপ্ত পানি পান করুন
• অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন
• রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখুন
• নিয়মিত ব্যায়াম করুন
• ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকুন
• চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করবেন না
• বছরে অন্তত একবার কিডনির প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করান
কিডনির রোগ এমন এক সমস্যা, যা অনেক সময় কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই শরীরে ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে। প্রস্রাবে কোনো সমস্যা না থাকলেই যে কিডনি সম্পূর্ণ সুস্থ, এমন ধারণা ভুল। তাই কিডনি বিকল হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে আগে থেকেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সুষম খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিডনিকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। সচেতন থাকুন, কারণ কিডনির যত্ন মানেই সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা।

