বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আরেকটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের জন্ম দিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের অধিকাংশ সময় পিছিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে লিওনেল মেসির দল। এখন বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে রবিবার ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
ম্যাচের ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ডই ফাইনালে জায়গা করে নেবে। কিন্তু শেষ কয়েক মিনিটে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। লিওনেল মেসির অসাধারণ দুটি অ্যাসিস্টে পরপর দুই গোল করে ম্যাচ নিজেদের করে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। আর সেই নাটকীয় জয়ে আবারও ফুটবল বিশ্বকে চমকে দেয় লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।
গোল হজমের পর থেকেই আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয় আর্জেন্টিনা। একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকে তারা। অবশেষে মেসির নিখুঁত পাস ধরে দূরপাল্লার শক্তিশালী শটে সমতা ফেরান এঞ্জো ফের্নান্দেজ। গোলের পর পুরো ম্যাচের গতি পাল্টে যায় এবং আর্জেন্টিনা নতুন আত্মবিশ্বাসে খেলতে শুরু করে।
সমতাসূচক গোলের পর ইংল্যান্ডের রক্ষণে নেমে আসে প্রবল চাপ। আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে থ্রি লায়ন্স। গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড একাধিক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। ম্যাক অ্যালিস্টারের শক্তিশালী হেড পোস্টে লেগে ফিরে আসে। তবে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার আক্রমণের সামনে টিকতে পারেনি ইংল্যান্ড।
গোল শোধের লক্ষ্যে দ্বিতীয়ার্ধে একসঙ্গে চারটি পরিবর্তন করেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। মাঠে নামেন নিকোলাস ওটামেন্ডি, রদ্রিগো ডি পল, গঞ্জালো মন্টিয়েল ও নিকো গঞ্জালেস। এই পরিবর্তনগুলো আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ ও আক্রমণে নতুন গতি এনে দেয়। বিশেষ করে ডি পলের উপস্থিতি মেসিকে আরও স্বাধীনভাবে খেলতে সাহায্য করে।
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার মূল লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডের আক্রমণ ঠেকানো। তবে গোল হজম করার পর পুরো কৌশল বদলে ফেলে তারা। রক্ষণাত্মক মনোভাব ছেড়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। দ্রুত পাস, উইং ব্যবহার এবং মেসিকে কেন্দ্র করে আক্রমণ গড়ে তুলতে থাকে দলটি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ইংল্যান্ডের আক্রমণ সফল হয়। ডান দিক থেকে ভেসে আসা ক্রসে অ্যান্টনি গর্ডন দুর্দান্ত ফিনিশিং করেন। ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো নিজের পেছনে থাকা গর্ডনকে নজরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় সহজেই গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন তিনি।
গোল হজমের আগেই দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণাত্মক শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা। বক্সের ভেতরে ঢুকে ইউলিয়ান আলভারেজ একটি ভালো সুযোগ পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি। এরপরও ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ চালিয়ে যায় দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।
প্রথমার্ধে দুই দলই রক্ষণে ছিল অত্যন্ত সতর্ক। মাঝমাঠে বলের দখল নিয়ে ছিল তীব্র লড়াই। কোনো দলই গোলমুখে কার্যকর শট নিতে পারেনি। ফলে প্রথম ৪৫ মিনিট শেষ হয় গোলশূন্য অবস্থায়।
ইংল্যান্ডের উচ্চগতির প্রেসিং সামাল দিতে প্রথমদিকে সমস্যায় পড়ে আর্জেন্টিনা। এরপর ধীরে ধীরে মেসির পায়ে বল রেখে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করে তারা। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ গড়ে তুলে সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা নেয় স্কালোনির দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ও শারীরিক ফুটবল খেলতে থাকে। প্রতিটি বলের জন্য ছিল কঠিন লড়াই। একাধিকবার দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয় রেফারিকে।
মাঠের খেলার পাশাপাশি গ্যালারিতেও ছিল তুমুল উত্তেজনা। আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা পুরো ম্যাচজুড়ে নিজেদের দলকে উজ্জীবিত করেন। মেসির প্রতিটি স্পর্শে স্টেডিয়াম গর্জে ওঠে। ইংল্যান্ডের জাতীয় সংগীতের সময়ও তাদের সমর্থকদের উচ্চস্বরে গান ও স্লোগান পুরো পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
শুরু থেকেই ইংল্যান্ড উচ্চ প্রেসিং কৌশল প্রয়োগ করে। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের বল ধরে রাখার সুযোগ দেয়নি তারা। ফলে মেসিকেও মাঝমাঠে নেমে এসে বল সংগ্রহ করতে হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্জেন্টিনা নিজেদের ছন্দে ফিরে আসে এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়।
এই ম্যাচে আর্জেন্টিনা দেখিয়েছে কেন তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। পুরো ম্যাচে পিছিয়ে থেকেও আত্মবিশ্বাস হারায়নি দলটি। মেসির নেতৃত্ব, স্কালোনির কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং খেলোয়াড়দের অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতা শেষ পর্যন্ত তাদের জয় এনে দিয়েছে।
ইংল্যান্ডকে নাটকীয়ভাবে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে নতুন ইতিহাস গড়ার পথে আর্জেন্টিনা। এখন তাদের সামনে শেষ বাধা স্পেন। রবিবারের মহারণে জয় পেলেই আরও একটি বিশ্বকাপ ট্রফি উঠবে লিওনেল মেসির হাতে। ফুটবলপ্রেমীদের চোখ এখন সেই বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনালের দিকেই, যেখানে নির্ধারিত হবে ২০২৬ সালের বিশ্বসেরা দলের নাম।

