Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeবিশ্ব সংবাদট্রাম্প-ইরান শান্তিচুক্তি কি সত্যিই কাছাকাছি? যুদ্ধবিরতি নিয়ে তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন

ট্রাম্প-ইরান শান্তিচুক্তি কি সত্যিই কাছাকাছি? যুদ্ধবিরতি নিয়ে তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কি শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে এসে থামতে চলেছে? আন্তর্জাতিক মহলে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন এটিই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এবং ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে সম্ভাব্য একটি সমঝোতা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। যদিও দুই পক্ষই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চুক্তির ঘোষণা দেয়নি, তবু কূটনৈতিক অঙ্গনে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে যে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের দিকে এগোচ্ছে।

মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি এবং পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে এখনো বেশ কিছু জটিল বিষয়ে আলোচনা বাকি রয়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন যে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছেছে। সেই চুক্তির আওতায় ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পথও খুলে যেতে পারে।

তবে পরিস্থিতি এখনো অনেকটাই অনিশ্চিত। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, কোনো চুক্তিই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, আলোচনার অগ্রগতি হলেও শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই দাবি করে আসছে, ইরানকে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, এই ইউরেনিয়াম ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে। অন্যদিকে ইরান বারবার বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনের জন্য।

এই ইস্যুই এখন আলোচনার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, আলোচকরা ভাষাগত এবং প্রযুক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে ঘন ঘন বৈঠক করছেন। কারণ একটি শব্দের ব্যাখ্যাও পরবর্তীতে বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।

ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে ইরান “সৎ উদ্দেশ্যে” আলোচনা করছে। এই মন্তব্যকে অনেকেই ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপরও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো দ্রুত সংঘাতের অবসান চায়। একই সঙ্গে মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট ও কিছু রিপাবলিকান সদস্যও যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ চলতে থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনও এখন কূটনৈতিক সমাধানের দিকে ঝুঁকছে।

যদিও ট্রাম্প একাধিকবার সতর্ক করেছেন যে “অপশন বি” অর্থাৎ সামরিক পদক্ষেপ এখনো পুরোপুরি বাতিল হয়নি। এর মাধ্যমে তিনি ইরানের ওপর চাপ ধরে রাখতে চাইছেন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সম্ভাব্য চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সমঝোতায় হরমুজ প্রণালিতে “নিরবচ্ছিন্ন” জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা থাকতে পারে। পাশাপাশি ইরানকে ৩০ দিনের মধ্যে ওই অঞ্চলে পাতা মাইন অপসারণ করতে হতে পারে।

চুক্তি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ শিথিল করতে পারে এবং ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞাতেও ছাড় দিতে পারে। এতে ইরান আবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি শুরু করার সুযোগ পাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু ইরানের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় স্বস্তির খবর হতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ট্রাম্পকে সম্ভাব্য সমঝোতার খসড়া দেখানো হয়েছে। তবে তিনি এখনো তাতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি। বিষয়টি নিয়ে তিনি আরও কয়েক দিন সময় নিতে পারেন।

অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ১৪ দফার একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন অংশ প্রকাশ করেছে। সেখানে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সরিয়ে নেওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক চলাচল পুনরুদ্ধারের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে হোয়াইট হাউস এই তথাকথিত খসড়াকে “সম্পূর্ণ মনগড়া” বলে দাবি করেছে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, দুই পক্ষ এখনো তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে খুব সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি দাবি করেছে, দক্ষিণ ইরানে নতুন মার্কিন হামলার জবাবে তারা অঞ্চলের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

এছাড়া ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তারা একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, কোনো মার্কিন বিমান ভূপাতিত হয়নি এবং সব আকাশযান নিরাপদ রয়েছে।

এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেখাচ্ছে যে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক। সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও আবার বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

যদি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছায়, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।

প্রথমত, বৈশ্বিক তেলবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। তৃতীয়ত, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও কিছুটা কমতে পারে।

তবে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি। ইরান কি সত্যিই তাদের ইউরেনিয়াম কর্মসূচি সীমিত করবে? যুক্তরাষ্ট্র কতটা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দুই দেশের মধ্যে বহু বছরের অবিশ্বাস কি এত সহজে দূর হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ঠিক করে দেবে, বর্তমান আলোচনা সত্যিই শান্তির দিকে যাচ্ছে, নাকি এটি কেবল আরেকটি অস্থায়ী বিরতি।