২০২৬ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিয়োনেল মেসি। বয়স ৩৯ পেরোলেও তাঁর পারফরম্যান্সে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। বরং প্রতিটি ম্যাচে গোল করে তিনি যেন আরও একবার প্রমাণ করছেন, কেন তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়। বিশ্বকাপে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গোল করেও আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন তিনি। বর্তমানে আটটি গোল করে গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়েও শীর্ষ সারিতে রয়েছেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক।
বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এ কাবো ভার্দের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ম্যাচটি ছিল দারুণ নাটকীয়। নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। শেষ পর্যন্ত ১২০ মিনিটের কঠিন লড়াই শেষে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচের ফলাফলের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে আসে মেসি এবং কাবো ভার্দের ডিফেন্ডার রবের্তো লোপেজের একটি সংক্ষিপ্ত কথোপকথন।
খেলার এক পর্যায়ে দেখা যায়, রবের্তো লোপেজের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলছেন লিয়োনেল মেসি। সেই দৃশ্য টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়তেই শুরু হয় নানা জল্পনা। পরে নিজেই সেই ঘটনার ব্যাখ্যা দেন লোপেজ।
তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই মেসির বড় ভক্ত। মাঠে নিজের আদর্শকে এত কাছ থেকে দেখে তিনি আবেগ সামলাতে পারেননি। তাই মেসির খুব কাছে গিয়ে তাঁকে হালকা স্পর্শ করেছিলেন। কিন্তু বিষয়টি মেসির পছন্দ হয়নি।
ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকারে রবের্তো লোপেজ বলেন, তিনি শুধু নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে সত্যিই তিনি লিয়োনেল মেসির বিপক্ষে খেলছেন।
লোপেজের কথায়, মেসির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কিছুটা বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন। সেই মুহূর্তে হালকা ধাক্কা দিয়ে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন। তবে মেসি সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে সতর্ক করে দেন।
আর্জেন্টিনা অধিনায়ক বলেন, “এটা ফাউল। এখানে বল নেই। তুমি এভাবে আমাকে ছুঁতে পারো না। আমাকে এভাবে টাচ করবে না।”
মেসির এই মন্তব্যে প্রথমে লোপেজের মনে হয়েছিল, হয়তো প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে বিভ্রান্ত করার কৌশল হিসেবে এমন কথা বলছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তাই তিনি বিষয়টি তখন খুব একটা গুরুত্ব দেননি।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার পর আবারও মেসির সঙ্গে কথা বলেন লোপেজ। এবার তিনি নিজের অনুভূতির কথা খোলাখুলি জানান।
লোপেজ বলেন, তিনি মেসিকে জানিয়েছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য কোনওভাবেই ফাউল করা ছিল না। বরং তিনি শুধু জীবনের অন্যতম প্রিয় ফুটবলারকে একবার স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন।
মজার ছলে তিনি আরও বলেন, মেসি যদি তাঁর পিছনে অবস্থান নেন, তাহলে তাঁকে সামলানো খুবই কঠিন হয়ে যাবে। তাই আগে থেকেই তাঁকে একবার ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা ছিল।
লোপেজের এই আন্তরিক ব্যাখ্যা শুনে মেসিও বিষয়টি বুঝতে পারেন। এরপর দু’জনের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয় এবং ম্যাচ চলাকালীনই তারা করমর্দন করেন।
রবের্তো লোপেজ স্বীকার করেছেন, লিয়োনেল মেসিকে কাছ থেকে দেখা তাঁর কাছে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। দীর্ঘদিন ধরে যাঁকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছেন, তাঁর বিপক্ষে মাঠে নেমে খেলাটাই ছিল স্বপ্নপূরণের মতো।
তিনি বলেন, মাঠে প্রতিপক্ষ হলেও মেসির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা কখনও কমেনি। বরং খুব কাছ থেকে মেসির আচরণ, মনোযোগ এবং ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা তাঁকে আরও বেশি মুগ্ধ করেছে।
বিশ্ব ফুটবলে অনেকেই ভেবেছিলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেসির প্রভাব কমে যাবে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি।
প্রতিটি ম্যাচেই গুরুত্বপূর্ণ গোল করছেন। শুধু গোল করাই নয়, আক্রমণ গড়ে তোলা, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং কঠিন মুহূর্তে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি অনন্য।
আর্জেন্টিনার আক্রমণের প্রধান ভরসা এখনও মেসি। দলের প্রয়োজনের সময় তিনি নিজেই দায়িত্ব তুলে নিচ্ছেন এবং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও শান্ত মানসিকতা আর্জেন্টিনাকে বড় ম্যাচে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে।
চলতি বিশ্বকাপে ইতোমধ্যেই আটটি গোল করে গোল্ডেন বুট জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার হয়ে উঠেছেন লিয়োনেল মেসি। প্রতিটি ম্যাচে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই ছন্দ বজায় থাকে, তাহলে শুধু গোল্ডেন বুট নয়, আরও একবার বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারের দৌড়েও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবেন তিনি।
শুধু কাবো ভার্দের রবের্তো লোপেজ নন, বিশ্বের অসংখ্য ফুটবলার, কোচ এবং ফুটবল বিশ্লেষক এখনও লিয়োনেল মেসির খেলায় মুগ্ধ। বয়সকে উপেক্ষা করে যেভাবে তিনি ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করছেন, তা আধুনিক ফুটবলে বিরল।
মাঠে তাঁর প্রতিটি স্পর্শ, নিখুঁত পাস, গোল করার ক্ষমতা এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা আজও তরুণ ফুটবলারদের অনুপ্রাণিত করে। প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রাও তাঁর বিরুদ্ধে খেলাকে সম্মানের বিষয় বলে মনে করেন।
কাবো ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচে রবের্তো লোপেজ ও লিয়োনেল মেসির ছোট্ট কথোপকথন ফুটবলপ্রেমীদের কাছে নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রথমে কঠোর ভাষায় সতর্ক করলেও পরে লোপেজের আন্তরিক অনুভূতি বুঝে সৌহার্দ্যের হাত বাড়িয়ে দেন মেসি। এই ঘটনায় যেমন মাঠের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ফুটে উঠেছে, তেমনই দেখা গেছে পারস্পরিক সম্মান ও ক্রীড়াসুলভ আচরণের দৃষ্টান্ত।
অন্যদিকে, ৩৯ বছর বয়সেও দুর্দান্ত ফর্মে থাকা মেসি আবারও প্রমাণ করছেন, প্রতিভা, পরিশ্রম এবং অভিজ্ঞতার সমন্বয় থাকলে বয়স কখনও সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ অভিযানে তাঁর অবদানই এখন দলের সবচেয়ে বড় শক্তি।

