খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালমার্ক কুকুরেয়ার চুলের রহস্য: অটিজমে আক্রান্ত ছেলের জন্য মাঠে চুল বাঁধেন না...

মার্ক কুকুরেয়ার চুলের রহস্য: অটিজমে আক্রান্ত ছেলের জন্য মাঠে চুল বাঁধেন না স্পেন তারকা

দর্শকাসনে বসে থাকা ছেলে মাতেয়ো যাতে সহজেই বাবাকে চিনতে পারে, সেই কারণেই তিনি নিজের পরিচিত চেহারা বদলান না। একই ধরনের জার্সি পরে মাঠে একসঙ্গে অনেক ফুটবলার খেলেন। অটিজ়মে আক্রান্ত শিশুর জন্য অনেক সময় এত মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট কাউকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

ফুটবল মাঠে মার্ক কুকুরেয়াকে একবার দেখলেই তাঁর কোঁকড়ানো লম্বা চুল আলাদা করে নজর কেড়ে নেয়। প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামানো কিংবা মাঝমাঠে দাপট দেখানোর পাশাপাশি এই চুলও তাঁর পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে অনেকেই জানেন না, এই স্টাইলের পেছনে লুকিয়ে আছে এক বাবার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং সন্তানের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার গল্প।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াজগতে কুকুরেয়ার খেলার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে কেন তিনি কখনও মাঠে চুল বাঁধেন না— সেই প্রশ্নের উত্তর জানার পর অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়েছেন। কারণ, তাঁর এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অটিজ়মে আক্রান্ত বড় ছেলে মাতেয়োর জীবন।

স্পেনের জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার মার্ক কুকুরেয়া শুধু একজন সফল খেলোয়াড় নন, তিনি একজন দায়িত্বশীল বাবাও। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি কোটি কোটি দর্শকের মন জয় করেছেন। কিন্তু মাঠের বাইরের জীবনেও প্রতিদিন তাঁকে লড়াই করতে হয় এক ভিন্ন বাস্তবতার সঙ্গে।

কুকুরেয়া এবং তাঁর সঙ্গী ক্লডিয়া রড্রিগেজ বহু আগেই প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, তাঁদের বড় ছেলে মাতেয়ো অটিজ়ম স্পেকট্রামে রয়েছে। বর্তমানে সাত বছর বয়সী মাতেয়োর বিশেষ যত্ন, নিয়মিত থেরাপি এবং আলাদা শেখার পরিবেশ প্রয়োজন হয়। এই বাস্তবতা মেনে নিতে গিয়ে গোটা পরিবারের জীবনযাত্রাই বদলে গেছে।

ছেলের অটিজ়ম ধরা পড়ার পর প্রথমদিকে কুকুরেয়া ও ক্লডিয়া বুঝতেই পারছিলেন না, কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেন। চিকিৎসকদের পরামর্শ, থেরাপি, বিশেষ শিক্ষা এবং প্রতিদিনের রুটিন— সবকিছুই নতুন করে সাজাতে হয়েছিল।

আরও পড়ুন :  পিএসজির ঐতিহাসিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়, ফ্রান্সজুড়ে উচ্ছ্বাস থেকে সহিংসতা—শত শত গ্রেপ্তার

শুধু সন্তানের চিকিৎসাই নয়, পরিবারের দৈনন্দিন পরিকল্পনাও মাতেয়োর প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হয়েছে। বেড়াতে যাওয়া, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কিংবা সাধারণ পারিবারিক সময় কাটানো— প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছেলের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তাঁরা।

এই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে একাধিকবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন কুকুরেয়া। তিনি মনে করেন, একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সন্তানের প্রয়োজনকে বোঝা এবং তার পাশে থাকা।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কুকুরেয়া ইচ্ছাকৃতভাবেই মাঠে চুল খোলা রাখেন। এর পেছনে ফ্যাশন নয়, রয়েছে একান্ত পারিবারিক কারণ।

দর্শকাসনে বসে থাকা ছেলে মাতেয়ো যাতে সহজেই বাবাকে চিনতে পারে, সেই কারণেই তিনি নিজের পরিচিত চেহারা বদলান না। একই ধরনের জার্সি পরে মাঠে একসঙ্গে অনেক ফুটবলার খেলেন। অটিজ়মে আক্রান্ত শিশুর জন্য অনেক সময় এত মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট কাউকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

কুকুরেয়ার বিশ্বাস, তাঁর লম্বা কোঁকড়ানো চুল ছেলের কাছে বাবাকে সহজে শনাক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই ব্যক্তিগত সুবিধার কথা না ভেবে তিনি নিজের চুল আগের মতোই রাখেন।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অটিজ়ম একটি নিউরোডেভেলপমেন্টাল কন্ডিশন বা স্নায়বিক বিকাশের ভিন্নতা। এটি কোনও সংক্রামক রোগ নয় এবং কারও ভুলের কারণেও হয় না।

আরও পড়ুন :  নেমারের চোটে দুশ্চিন্তায় ব্রাজ়িল! নিজের হেলিকপ্টারে শিবিরে যোগ, প্রথম দিন অনুশীলনে নামলেন না তারকা ফুটবলার

এই অবস্থায় শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ, ভাষা ব্যবহার, আচরণ এবং চারপাশের পরিবেশ বোঝার ক্ষেত্রে কিছু আলাদা চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় তারা পরিচিত মানুষকেও ভিড়ের মধ্যে সহজে চিনতে পারে না বা নতুন পরিস্থিতিতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

তবে সঠিক সময়ে মূল্যায়ন, উপযুক্ত থেরাপি, বিশেষ শিক্ষার সুযোগ এবং পরিবারের অবিচ্ছিন্ন সহযোগিতা পেলে অটিজ়মে আক্রান্ত শিশুরাও নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে পারে।

মনোবিদদের মতে, অটিজ়মে আক্রান্ত শিশুদের জন্য পরিচিত মুখ, নির্দিষ্ট রং, বিশেষ ভঙ্গি বা আলাদা বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

যদি কোনও শিশু ভিড়ের মধ্যে বাবা বা মাকে চিনতে সমস্যায় পড়ে, তাহলে অভিভাবকের একটি নির্দিষ্ট পরিচিত বৈশিষ্ট্য তাকে নিরাপত্তাবোধ দিতে পারে। কুকুরেয়ার লম্বা চুলও ঠিক তেমনই একটি পরিচিত চিহ্ন, যা মাতেয়োকে মাঠের ভিড়েও বাবাকে খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ছোট ছোট উদ্যোগ শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং তাদের পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

কুকুরেয়ার সঙ্গী ক্লডিয়া রড্রিগেজও বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, প্রথমদিকে তাঁদের কাছে সবকিছুই ছিল অজানা। কীভাবে সন্তানের যত্ন নিতে হবে, কোন থেরাপি প্রয়োজন, কীভাবে প্রতিদিনের জীবনকে গুছিয়ে নেওয়া যাবে— সবই নতুন করে শিখতে হয়েছে।

তবে ধীরে ধীরে তাঁরা বুঝেছেন, অটিজ়ম কোনও সীমাবদ্ধতার গল্প নয়; বরং এটি ভিন্নভাবে পৃথিবীকে দেখার একটি প্রক্রিয়া। তাই সন্তানের প্রতি ধৈর্য, গ্রহণযোগ্যতা এবং ভালোবাসাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন :  গরুর মাংসের শুঁটকি: হারিয়ে না যাওয়া এক ঐতিহ্যবাহী স্বাদের গল্প

নিজের সন্তানের অটিজ়ম নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস দেখিয়ে মার্ক কুকুরেয়া অসংখ্য অভিভাবকের কাছে অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন। অনেক পরিবার এখনও সামাজিক সংকোচ বা ভুল ধারণার কারণে বিষয়টি লুকিয়ে রাখতে চান। কুকুরেয়ার মতো পরিচিত একজন ক্রীড়াবিদ যখন খোলাখুলিভাবে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন, তখন সমাজে সচেতনতা বাড়ে এবং অটিজ়ম নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাও কমতে শুরু করে।

তাঁর এই বার্তা স্পষ্ট— সন্তানের বিশেষ প্রয়োজনকে লজ্জা নয়, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ দিয়েই গ্রহণ করা উচিত।

ফুটবল মাঠে মার্ক কুকুরেয়ার লম্বা চুল হয়তো অনেকের কাছে শুধু একটি স্টাইল। কিন্তু তাঁর পরিবারের কাছে এটি এক বাবার ভালোবাসার প্রতীক। নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে সন্তানের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেওয়া একজন অভিভাবকের মানবিক সিদ্ধান্তই আজ বিশ্বজুড়ে মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

অটিজ়ম কোনও রোগ নয়, এটি স্নায়বিক বিকাশের একটি ভিন্ন ধরন। সময়মতো মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় থেরাপি, সহানুভূতিশীল পরিবেশ এবং পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকলে অটিজ়মে থাকা শিশুরাও নিজেদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারে। আর মার্ক কুকুরেয়ার গল্প মনে করিয়ে দেয়— কখনও কখনও একজন বাবার ভালোবাসাই সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি।