ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সফল অধিনায়ক ও ওপেনার রোহিত শর্মাকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে অবসরের জোর আলোচনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন তৃতীয় একদিনের ম্যাচটি নাকি হতে পারে ভারতের জার্সিতে তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচ। ক্রিকেট মহলে এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়তেই ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। যদিও এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কিংবা রোহিত শর্মার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবুও বিভিন্ন সূত্রের দাবি, নির্বাচকদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আর নেই এই অভিজ্ঞ ব্যাটার।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লর্ডসে অনুষ্ঠিতব্য তৃতীয় একদিনের ম্যাচকে ঘিরে আলোচনার মূল কারণ হলো নির্বাচকদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারতীয় ক্রিকেটে এখন নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দেওয়ার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পরিবর্তে তরুণদের সামনে এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফলে অনেকের মতে, এই ম্যাচটি রোহিত শর্মার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে ইতোমধ্যেই সরে দাঁড়ানোর পর এবার ওয়ানডে ক্রিকেট থেকেও অবসর নেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীরকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচক কমিটির সদস্যরা রোহিত শর্মার সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকেই তাঁকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
নির্বাচকদের বিশ্বাস, ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এখন থেকেই নতুন দল গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই যশস্বী জয়সওয়ালের মতো প্রতিভাবান তরুণ ক্রিকেটারদের ধারাবাহিকভাবে সুযোগ দিতে চায় টিম ম্যানেজমেন্ট।
ভারতীয় ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও ভবিষ্যতের দল গঠনের ক্ষেত্রে রোহিত শর্মাকে আর কেন্দ্রীয় পরিকল্পনায় রাখা হচ্ছে না বলেই বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
ভারতীয় ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত তরুণদের একজন যশস্বী জয়সওয়াল। ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, আক্রমণাত্মক ব্যাটিং এবং বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য তাঁকে ভবিষ্যতের অন্যতম ভরসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, যশস্বীর মতো তরুণদের নিয়মিত সুযোগ দিতে হলে অভিজ্ঞদের জায়গা ছাড়তেই হবে। এমনকি শতরান করার পরও কখনও কখনও একাদশের বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। ফলে নির্বাচকদের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে তরুণদের দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ইংল্যান্ড সফরের মধ্যেই কয়েকজন বোর্ড কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন রোহিত শর্মা। সেখানে তিনি নির্বাচকদের সিদ্ধান্তে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা যায়।
তবে সেই আলোচনা শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি বদলাতে পারেনি। নির্বাচক কমিটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অটল থেকেছে এবং নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়ার নীতিতেই এগোচ্ছে।
যদিও এসব তথ্যের কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এখনও পাওয়া যায়নি, তবুও ক্রিকেট মহলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
গত বছর ভারতীয় ওয়ানডে দলের অধিনায়কের দায়িত্ব থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল রোহিত শর্মাকে। এরপর থেকেই অনেকেই মনে করেছিলেন, ধীরে ধীরে জাতীয় দলে তাঁর ভূমিকা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।
টেস্ট ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোর পর সেই ধারণা আরও জোরালো হয়। এখন ওয়ানডে ক্রিকেট নিয়েও একই ধরনের আলোচনা শুরু হওয়ায় অনেকেই মনে করছেন, ভারতীয় ক্রিকেটে একটি যুগের সমাপ্তি খুব কাছেই।
রোহিত শর্মার নেতৃত্বে ভারতীয় ক্রিকেট অসাধারণ কিছু মুহূর্ত উপহার পেয়েছে। তাঁর অধিনায়কত্বে ভারত ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছিল। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে ফাইনালের আগে পর্যন্ত অপরাজিত ছিল দল।
এরপর আরও একবার তাঁর নেতৃত্বেই ভারত সাহসী ও আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে নেয়। সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের পরই টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান রোহিত।
শুধু অধিনায়ক হিসেবেই নয়, ওপেনার হিসেবে অসংখ্য ম্যাচে ভারতকে শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে একাধিক রেকর্ড, ডাবল সেঞ্চুরি এবং ম্যাচজয়ী ইনিংস, যা ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডসের ম্যাচটি তাই শুধু একটি সিরিজের ম্যাচ নয়, বরং ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য আবেগঘন এক উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে। যদি সত্যিই এটি রোহিত শর্মার শেষ ওয়ানডে ম্যাচ হয়, তাহলে ক্রিকেটপ্রেমীরা একজন কিংবদন্তিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শেষবারের মতো ভারতের জার্সিতে দেখতে পাবেন।
অবশ্য এখনও পর্যন্ত রোহিত শর্মা কিংবা বিসিসিআই আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের বিষয়ে কিছু জানায়নি। ফলে বিষয়টি এখনো জল্পনার পর্যায়েই রয়েছে। তবে আগামী রবিবারের ম্যাচকে ঘিরে যে উত্তেজনা ও আবেগ তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয়।
ভারতীয় ক্রিকেট এখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে অভিজ্ঞদের বিদায়, অন্যদিকে নতুনদের উত্থান—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের দল। রোহিত শর্মার মতো একজন কিংবদন্তির বিদায় যদি সত্যিই আসন্ন হয়, তাহলে সেটি হবে ভারতীয় ক্রিকেটের এক স্মরণীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার সূচনাও হবে সেটি।
এখন সকলের নজর লর্ডসের দিকে। রবিবারের ম্যাচ শেষে রোহিত শর্মা কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটিই হয়তো নির্ধারণ করবে ভারতীয় ক্রিকেটের পরবর্তী পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

