ফুটবল বিশ্বে এমন কিছু দ্বৈরথ আছে, যেগুলো শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং ইতিহাস, আবেগ, প্রতিশোধ এবং গৌরবের প্রতীক। ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই ঠিক তেমনই একটি অধ্যায়। মাঠের ৯০ মিনিট শেষ হলেও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেশ বহু বছর ধরে থেকে যায়। বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই দলের প্রতিটি সাক্ষাৎ জন্ম দিয়েছে নতুন গল্প, নতুন বিতর্ক এবং অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।
২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হতে চলেছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ফলে ফুটবলপ্রেমীদের উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২০০–এর বেশি ম্যাচ খেলেও লিওনেল মেসি কখনও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামেননি। ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এসে অবশেষে তিনি মুখোমুখি হতে চলেছেন বহু আলোচিত এই প্রতিপক্ষের।
দুই দেশের মধ্যে এখন পর্যন্ত মোট ১৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ইংল্যান্ড জয় পেয়েছে ৬টিতে, আর্জেন্টিনা জিতেছে ৩টিতে এবং ৫টি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসেও ইংল্যান্ডের সামান্য এগিয়ে থাকা দেখা যায়। দুই দল পাঁচবার বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছে। সেখানে ইংল্যান্ড জিতেছে তিনটি ম্যাচে, আর আর্জেন্টিনা জয় পেয়েছে দুটি ম্যাচে।
তবে শুধু সংখ্যার হিসাব দিয়ে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্ব বোঝানো সম্ভব নয়। প্রতিটি ম্যাচই ফুটবল ইতিহাসে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
চিলিতে অনুষ্ঠিত ১৯৬২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। সেই ম্যাচে ইংল্যান্ড ৩-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। যদিও তখনও এই দ্বৈরথে তেমন উত্তেজনা তৈরি হয়নি।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপই ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা সম্পর্ককে নতুন মোড় দেয়। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে জার্মান রেফারি মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন।
সে সময় ফুটবলে লাল ও হলুদ কার্ডের নিয়ম চালু হয়নি। ফলে সিদ্ধান্তটি ঘিরে তৈরি হয় চরম উত্তেজনা। রাত্তিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ এসে তাঁকে মাঠের বাইরে নিয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়ে সেমিফাইনালে ওঠে। কিন্তু এই ম্যাচের পর থেকেই দুই দেশের ফুটবল সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে।
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলোর একটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত তখনও দুই দেশের মানুষের মনে তাজা। সেই আবহেই মাঠে নামে দুই দল।
দিয়েগো মারাদোনা প্রথমে করেন বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল, যা রেফারির চোখ এড়িয়ে যায়। কয়েক মিনিট পরই তিনি পাঁচজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল।
আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জয় পায় এবং মারাদোনা জাতীয় বীরের মর্যাদা পান। এই ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
ফ্রান্স বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে আবারও মুখোমুখি হয় দুই দল।
নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ২-২ সমতায় শেষ হয়। তবে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে দ্বিতীয়ার্ধে।
আর্জেন্টিনার দিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডেভিড বেকহ্যাম প্রতিপক্ষকে লাথি মারেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন।
১০ জন নিয়ে খেলেও ইংল্যান্ড ম্যাচকে টাইব্রেকারে নিয়ে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাই জয় নিশ্চিত করে এবং বেকহ্যাম দীর্ঘদিন সমালোচনার মুখে পড়েন।
চার বছর পর আবারও বিশ্বকাপে দেখা হয় দুই দলের। এবার গ্রুপ পর্বে।
ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলেই ইংল্যান্ড ১-০ ব্যবধানে জয় পায়। ১৯৯৮ সালের হতাশার প্রতিশোধও অনেকটা পূরণ হয়।
অন্যদিকে সেই পরাজয়ের ধাক্কা সামলাতে না পেরে আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
লিওনেল মেসির ক্যারিয়ার অসংখ্য রেকর্ডে ভরা। তিনি প্রায় সব বড় ফুটবল শক্তির বিপক্ষেই খেলেছেন। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয়, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর কখনও আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়নি।
২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারে।
মেসির জন্য এটি শুধু আরেকটি ম্যাচ নয়। এটি হতে পারে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। অন্যদিকে ইংল্যান্ডও চাইবে ইতিহাসে নিজেদের আধিপত্য আরও শক্তিশালী করতে।
ইংল্যান্ডের বর্তমান দল গতির ওপর নির্ভরশীল। মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণ তাদের বড় শক্তি। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা বলের দখল ধরে রেখে ধৈর্যের সঙ্গে সুযোগ তৈরি করতে অভ্যস্ত।
ম্যাচের ফল নির্ভর করতে পারে মাঝমাঠের লড়াই, রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং বড় মুহূর্তে তারকাদের পারফরম্যান্সের ওপর। ছোট একটি ভুল কিংবা একটি অসাধারণ মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের চিত্র।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ মানেই আবেগ, নাটক এবং ইতিহাস। ১৯৬৬ সালের বিতর্ক, ১৯৮৬ সালের মারাদোনার জাদু, ১৯৯৮ সালের সিমিওনে-বেকহ্যাম ঘটনা কিংবা ২০০২ সালের প্রতিশোধ—প্রতিটি অধ্যায় ফুটবলকে দিয়েছে নতুন গল্প।
এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে পারে আরও একটি স্মরণীয় অধ্যায়। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসি কি প্রথমবার ইংল্যান্ডকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস লিখবেন? নাকি ইংল্যান্ড অতীতের সাফল্য ধরে রেখে ফাইনালে জায়গা করে নেবে?
উত্তর মিলবে মাঠেই। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের এই মহারণ শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের আরেকটি সম্ভাব্য ক্লাসিক, যা বহু বছর ধরে আলোচনায় থাকবে।

