খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালবিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনাকে হারাতে কেন এত মরিয়া ফুটবলপ্রেমীরা? নেপথ্যের আসল কারণ!

বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনাকে হারাতে কেন এত মরিয়া ফুটবলপ্রেমীরা? নেপথ্যের আসল কারণ!

সেই জয়ের মুহূর্ত শুধু আর্জেন্টিনার জন্য নয়, বিশ্বের অসংখ্য ফুটবলপ্রেমীর কাছেও ছিল আবেগঘন। অনেক নিরপেক্ষ দর্শকও মনে করেছিলেন, মেসির হাতে বিশ্বকাপ ওঠাই যেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তিগুলোর একটি।

ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি আবেগ, স্মৃতি, গর্ব এবং পরিচয়ের এক অসাধারণ মিশেল। তাই কোনো দল বা ফুটবলারের সাফল্য যেমন কোটি মানুষের আনন্দের কারণ হয়, তেমনি সেই সাফল্যই অন্য একদল সমর্থকের মধ্যে হতাশা, ঈর্ষা কিংবা বিরূপ মনোভাবও তৈরি করতে পারে। বর্তমান সময়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে ঘিরে ঠিক এমনই একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

একসময় যে দলকে বড় ম্যাচে হেরে যাওয়ার জন্য কটাক্ষ করা হতো, সেই আর্জেন্টিনাই এখন বিশ্বজয়ী। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্বকাপ জয়ের পর তাদের প্রতি সমর্থনের পাশাপাশি বেড়েছে সমালোচনাও। অনেক ফুটবলপ্রেমী এখন প্রকাশ্যেই চান আর্জেন্টিনা হেরে যাক। প্রশ্ন হলো, কেন এমন পরিবর্তন?

খেলাধুলার ইতিহাসে একটি বিষয় বারবার দেখা গেছে। কোনো দল দীর্ঘদিন ব্যর্থ থাকলে নিরপেক্ষ সমর্থকদের সহানুভূতি তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সবাই চায় তারা একদিন সফল হোক। কিন্তু সেই দল একবার বড় শিরোপা জিতে নিলে পরিস্থিতি বদলে যায়।

আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে। বহু বছর ধরে ফাইনালে হারের হতাশা, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্যর্থতা এবং লিওনেল মেসির অপূর্ণ স্বপ্ন কোটি ফুটবলপ্রেমীকে আবেগতাড়িত করেছিল। কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের পর সেই আবেগের জায়গায় অনেকের মধ্যে জন্ম নিয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব।

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় দলের হয়ে বড় ট্রফি জিততে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে মেসিকে। একের পর এক কোপা আমেরিকার ফাইনাল এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজয় তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল।

আরও পড়ুন :  ইয়ামালের জাদুতে এমবাপেদের হারিয়ে ফ্রান্সকে উড়িয়ে দিল দে লা ফুয়েন্তের মাস্টারপ্ল্যান

২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। পরে সতীর্থ, সমর্থক এবং দেশের মানুষের অনুরোধে আবার ফিরে আসেন।

এই কঠিন সময়ে মেসি যেন হয়ে উঠেছিলেন এক ট্র্যাজিক নায়ক। অসাধারণ প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় দলের হয়ে বড় সাফল্য না পাওয়ার গল্প মানুষকে তাঁর আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।

২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় আর্জেন্টিনার ভাগ্য বদলের সূচনা করে। এরপর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে পূর্ণতা পায় বহু বছরের স্বপ্ন।

সেই জয়ের মুহূর্ত শুধু আর্জেন্টিনার জন্য নয়, বিশ্বের অসংখ্য ফুটবলপ্রেমীর কাছেও ছিল আবেগঘন। অনেক নিরপেক্ষ দর্শকও মনে করেছিলেন, মেসির হাতে বিশ্বকাপ ওঠাই যেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তিগুলোর একটি।

কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পরই বদলে যেতে শুরু করে সমর্থকদের একটি অংশের মনোভাব।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচ এখন বাড়তি নজরে দেখা হচ্ছে। রেফারিংয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, পেনাল্টি কিংবা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)-এর ব্যবহার নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনা শুরু হয়।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপ উদ্বোধনে ‘নকল শাকিরা’? নেটদুনিয়ায় তোলপাড়! আসল সত্যি কী?

অনেকেই দাবি করেন, বড় সিদ্ধান্তগুলো নাকি আর্জেন্টিনার পক্ষেই যায়। যদিও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বড় টুর্নামেন্টে পেনাল্টি সুবিধা পাওয়ার তালিকায় আর্জেন্টিনা কোনো ব্যতিক্রমী অবস্থানে নেই।

তবুও সামাজিক মাধ্যমে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ ফিফার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এসব অভিযোগের বড় অংশই আবেগনির্ভর এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অভাবে বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

খেলাধুলায় একটি স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা রয়েছে। যখন কোনো দল ধারাবাহিকভাবে জয় পেতে থাকে, তখন অনেক নিরপেক্ষ দর্শকও নতুন চ্যালেঞ্জ দেখতে চান। তারা চায় শক্তিশালী দলকে কেউ হারিয়ে দিক।

ফলে বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনা এখন আর কেবল জনপ্রিয় দল নয়, তারা অনেকের চোখে পরাজিত করার মতো সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।

এই মানসিকতা শুধু আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেই নয়। অতীতে ব্রাজিল, স্পেন, জার্মানি কিংবা ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার সিটির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।

ফুটবলে আবেগের বড় অংশ জড়িয়ে থাকে নিজের প্রিয় দলকে ঘিরে। যখন সেই দল বিশ্বচ্যাম্পিয়নের কাছে হেরে যায়, তখন হতাশা থেকে জন্ম নিতে পারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া।

অনেক সমর্থক মনে করেন, তাদের দল অবিচারের শিকার হয়েছে। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, রেফারিং বা ভাগ্যের কারণে প্রতিপক্ষ এগিয়ে গেছে। এসব অনুভূতি থেকেই সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা, ট্রোল কিংবা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপে দুই মহারণ! ব্রাজিলের অভিশাপ ভাঙবে, নাকি চমক দেখাবে নরওয়ে ও মেক্সিকো?

বর্তমান যুগে একটি ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার ভিডিও, বিশ্লেষণ এবং মতামত ছড়িয়ে পড়ে।

ছোট একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তও মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। ফলে বাস্তবের তুলনায় বিতর্ক অনেক বড় আকার ধারণ করে। আর্জেন্টিনা এবং মেসিকে ঘিরে চলমান আলোচনাও অনেকাংশে সামাজিক মাধ্যমের এই প্রভাবের ফল।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর প্রত্যাশাও বেড়ে যায় বহুগুণ। এখন আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচ থেকে সমর্থকরা সেরা পারফরম্যান্স আশা করেন। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ দলগুলোও বিশ্বসেরাদের হারিয়ে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে চায়।

ফলে আর্জেন্টিনার প্রতিটি জয় যেমন প্রশংসিত হয়, তেমনি প্রতিটি ভুল বা বিতর্কও অনেক বেশি আলোচিত হয়।

আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক আসলে ফুটবলের স্বাভাবিক বাস্তবতারই অংশ। একসময়ের হতাশার প্রতীক দল আজ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আর বিশ্বজয়ীদের বিরুদ্ধে বাড়তি প্রত্যাশা, সমালোচনা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই।

লিওনেল মেসির দীর্ঘ সংগ্রাম তাঁকে যেমন কোটি মানুষের হৃদয়ের নায়ক বানিয়েছে, তেমনি তাঁর সাফল্য এখন নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দিয়েছে। ফুটবলের সৌন্দর্যও এখানেই—আজকের নায়ক আগামী ম্যাচেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারেন। আর সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই বিশ্ব ফুটবলকে আরও আকর্ষণীয়, আবেগময় এবং অনিশ্চিত করে তোলে।

আর্কাইভ