খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশাললিওনেল মেসিকে থামানোর রহস্য ফাঁস! যেসব কৌশলে সফল হয়েছিলেন কিংবদন্তি কোচরা

লিওনেল মেসিকে থামানোর রহস্য ফাঁস! যেসব কৌশলে সফল হয়েছিলেন কিংবদন্তি কোচরা

ব্রাউন পরে স্মৃতিচারণ করে জানান, পুরো ম্যাচে তার মাথায় শুধু একটি কথাই ঘুরছিল—"ঝাঁপ দিও না"। কারণ মেসির অসাধারণ ড্রিবলিংয়ের সামনে ভুল সময়ে ট্যাকল করতে গেলে তিনি সহজেই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন।

লিওনেল মেসিকে থামানো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। বল পায়ে থাকলে তিনি মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারেন। তাই বড় টুর্নামেন্টে মেসির মুখোমুখি হওয়ার আগে প্রতিপক্ষের কোচরা শুধু কৌশল নয়, মানসিক প্রস্তুতিও নেন। এবার বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেলের সামনেও একই চ্যালেঞ্জ।

তবে ইতিহাস বলছে, মেসিকে পুরোপুরি থামানো কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। অতীতে কয়েকজন কোচ ও ফুটবলার বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে তাকে প্রভাবহীন রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের সেই সফল কৌশলগুলোই এখন নতুন করে আলোচনায়।

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সীমিত জায়গায় খেলার দক্ষতা। একা একজন ডিফেন্ডারের পক্ষে তাকে সামলানো প্রায় অসম্ভব।

এ কারণেই বিভিন্ন সময়ে সফল কোচরা ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন। কেউ দূরত্ব বজায় রেখে রক্ষণ করেছেন, কেউ আবার দলগতভাবে তাকে ঘিরে ফেলেছেন। এমনকি কেউ কেউ মানসিক চাপ কমানোর জন্য আলাদা মনস্তাত্ত্বিক কৌশলও ব্যবহার করেছেন।

২০০৮ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিলেন তরুণ লিওনেল মেসি। ইনজুরির কারণে নিয়মিত ডিফেন্ডার খেলতে না পারায় দায়িত্ব পড়ে ওয়েস ব্রাউনের ওপর।

তৎকালীন কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের নির্দেশ ছিল অত্যন্ত সহজ—অযথা ট্যাকলে ঝাঁপিয়ে পড়বে না।

ব্রাউন পরে স্মৃতিচারণ করে জানান, পুরো ম্যাচে তার মাথায় শুধু একটি কথাই ঘুরছিল—”ঝাঁপ দিও না”। কারণ মেসির অসাধারণ ড্রিবলিংয়ের সামনে ভুল সময়ে ট্যাকল করতে গেলে তিনি সহজেই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন।

ব্রাউনের লক্ষ্য ছিল ধৈর্য ধরে অবস্থান বজায় রাখা এবং মেসিকে ক্রমাগত বিরক্ত করা। এর ফলে ইউনাইটেড দুই লেগেই ক্লিন শিট রাখে এবং অল্প ব্যবধানে ফাইনালে উঠে যায়।

২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনালে ইন্টার মিলানের কোচ ছিলেন জোসে মরিনহো। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন ফুটবলার দিয়ে মেসিকে মার্কিং করালে সেটি উল্টো দলের জন্য বিপদ ডেকে আনবে।

তাই তিনি তৈরি করেন একটি বিশেষ পরিকল্পনা।

মেসির চারপাশে সব সময় একাধিক খেলোয়াড়কে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। জাভিয়ের জানেত্তি, এস্টেবান কাম্বিয়াসো এবং থিয়াগো মোত্তা একসঙ্গে মেসির চলাফেরার জায়গা সংকুচিত করে দেন। প্রয়োজনে ওয়েসলি স্নেইডারও রক্ষণে নেমে আসতেন।

এই কৌশলের ফলে মেসি দুই লেগের কোনো ম্যাচেই গোল করতে পারেননি। ইন্টার মিলানও মোট ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায়।

মরিনহো পরে বলেন, মেসিকে মানুষে মানুষে মার্কিং নয়, বরং চারদিক থেকে ঘিরে ফেলাই ছিল তাদের মূল পরিকল্পনা। তার ভাষায়, এটি ছিল যেন একটি “খাঁচা”, যেখানে মেসি নিজের স্বাভাবিক খেলা খেলার সুযোগই পাননি।

আতলেতিকো মাদ্রিদের কোচ দিয়েগো সিমিওনে বিশ্বাস করতেন, মেসিকে মোকাবিলা করার লড়াই শুধু মাঠে নয়, খেলোয়াড়দের মনেও হয়।

সাবেক ডিফেন্ডার ফিলিপে লুইস এক সাক্ষাৎকারে জানান, ম্যাচের আগে সিমিওনে কখনও মেসির নাম উচ্চারণ করতেন না। তিনি তাকে অন্য একটি ডাকনামে উল্লেখ করতেন, যাতে খেলোয়াড়দের মনে অযথা ভয় তৈরি না হয়।

শুধু তাই নয়, সিমিওনে অনেক সময় চারজন ফুটবলারকে একসঙ্গে মেসির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিতেন।

তার ধারণা ছিল, একজন খেলোয়াড়ের ওপর পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে চাপ বেড়ে যায়। কিন্তু দলগতভাবে কাজ করলে আত্মবিশ্বাসও বাড়ে এবং ভুলের সম্ভাবনাও কমে।

আতলেতিকো মাদ্রিদের সাবেক ডিফেন্ডার কিয়েরান ট্রিপিয়ারও সিমিওনের অধীনে মেসির বিপক্ষে খেলেছেন।

তার মতে, মেসিকে থামানোর নির্দিষ্ট কোনো ফর্মুলা নেই। অনেক সময় কোচ কৌশল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা না করে শুধু খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে বলতেন।

ট্রিপিয়ারের ভাষায়, মেসির মতো ফুটবলারের বিপক্ষে অতিরিক্ত পরিকল্পনা করেও সব সময় সফল হওয়া যায় না। কারণ তিনি এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি মুহূর্তের মধ্যে অপ্রত্যাশিত কিছু করে বসতে পারেন।

মেসির ক্যারিয়ারে সবচেয়ে কঠিন ডিফেন্ডার হিসেবে যাঁর নাম তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন, তিনি হলেন পাবলো মাফেও।

জিরোনার হয়ে খেলতে গিয়ে মাফেও পুরো ম্যাচে ছায়ার মতো মেসির সঙ্গে ছিলেন। বল যেখানে থাকুক, মাফেওর মূল লক্ষ্য ছিল মেসিকে স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করতে না দেওয়া।

পরে এক সাক্ষাৎকারে মেসি স্বীকার করেন, তার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে কঠিন ব্যক্তিগত মার্কিং করেছিলেন মাফেও।

তবে এই গল্পের আরেকটি দিকও রয়েছে।

মেসিকে অনেকটাই আটকে রাখা গেলেও বার্সেলোনা শেষ পর্যন্ত ৩-০ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে নেয়। অর্থাৎ শুধু মেসিকে থামালেই পুরো দলকে থামানো যায় না।

বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হবে মেসির প্রভাব কমিয়ে আনা।

থমাস টুখেল নিশ্চয়ই অতীতের এসব সফল পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করেছেন। তবে আধুনিক ফুটবলে মেসিকে থামানোর কোনো একক উপায় নেই। কখনও ধৈর্য, কখনও দলগত প্রেসিং, আবার কখনও মানসিক দৃঢ়তা—সবকিছুর সমন্বয়ই হতে পারে সাফল্যের চাবিকাঠি।

ফুটবল ইতিহাস প্রমাণ করে, মেসিকে তুলনামূলকভাবে শান্ত রাখা সম্ভব হলেও তার দলের অন্য খেলোয়াড়রা তখন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারেন।

তাই শুধু একজন ফুটবলারকে আটকে রাখার পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। পুরো দলের আক্রমণভাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি নিজেদের সুযোগও কাজে লাগাতে হবে।

আসন্ন বিশ্বকাপের মহারণে ইংল্যান্ড সেই ভারসাম্য কতটা বজায় রাখতে পারে, সেটিই নির্ধারণ করবে তারা ফাইনালে পৌঁছাতে পারবে কি না। অতীতের অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে, কিন্তু মেসির মতো কিংবদন্তির বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত মাঠের পারফরম্যান্সই সব পার্থক্য গড়ে দেয়।