খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদওয়েস্ট বেঙ্গল২০ বছর পর কলকাতায় ফিরছেন তসলিমা নাসরিন! কী বদলাল পশ্চিমবঙ্গে?

২০ বছর পর কলকাতায় ফিরছেন তসলিমা নাসরিন! কী বদলাল পশ্চিমবঙ্গে?

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর আবারও কলকাতার মাটিতে পা রাখতে চলেছেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ আগস্ট কলকাতার রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠিত একটি মৌলবাদবিরোধী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনুষ্ঠানে তসলিমা নিজের কবিতা পাঠ করবেন এবং তাঁর কবিতা অবলম্বনে নির্মিত গানও পরিবেশিত হবে। এই প্রত্যাবর্তন ঘিরে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তসলিমা নাসরিন বহু বছর ধরেই নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখালেখি তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করলেও একই সঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতেও নিয়ে এসেছে। কলকাতা তাঁর কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত শহর হলেও ২০০৭ সালের পর নানা ঘটনার জেরে তাঁকে শহর ছাড়তে হয়।

এবার সেই দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটিয়ে আবারও কলকাতায় ফিরছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেই এই সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর এই ঘোষণা প্রকাশ্যে আসার পর সাহিত্যপ্রেমী ও পাঠকদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে।

১ আগস্টের অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে সেক্যুলার মিশন এবং এইচআরবিএফএফ। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি মূলত মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ ও মৌলবাদবিরোধী অবস্থানকে সামনে রেখে আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে তসলিমা নাসরিনের কবিতা পাঠের পাশাপাশি তাঁর কবিতার ভিত্তিতে নির্মিত সঙ্গীতও পরিবেশিত হবে। আয়োজকরা তাঁকে “মৌলবাদবিরোধী প্রতিবাদের প্রতীক” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

২০০৭ সালে তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বইটির বিষয়বস্তু নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র আপত্তি ওঠে। কলকাতার একাধিক এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।

সে সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং শেষ পর্যন্ত তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা ছেড়ে যেতে হয়। এরপর থেকেই তাঁর কলকাতা প্রত্যাবর্তন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।

তসলিমার প্রত্যাবর্তনের খবর প্রকাশ্যে আসতেই আবারও সামনে এসেছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, লেখকের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় মৌলবাদ নিয়ে পুরনো বিতর্ক।

সমর্থকদের একাংশের মতে, একজন লেখক তাঁর মতামত প্রকাশের অধিকার রাখেন এবং সাহিত্যিকদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, বিতর্কিত বিষয় নিয়ে লেখালেখির সামাজিক প্রভাবও বিবেচনায় রাখা উচিত।

ফলে তাঁর কলকাতা সফর কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনারও অংশ হয়ে উঠেছে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা মোহিত রায় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হবে। তাঁর দাবি, এটি কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং সম্পূর্ণ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক একটি আয়োজন।

আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।

তসলিমা নাসরিনের সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

বিজেপির একাংশের নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর কলকাতায় ফেরার পক্ষে মত প্রকাশ করে আসছিলেন। তাঁদের দাবি, মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার একজন লেখকের পশ্চিমবঙ্গে আসার সুযোগ থাকা উচিত।

অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, তসলিমার সফর নিয়ে অতিরিক্ত রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের প্রশাসনিক অবস্থানের সমন্বয়ের ফলেই এই সফর সম্ভব হয়েছে।

সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় আসা ইতিবাচক বিষয়। তবে তিনি এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করতে চান না।

তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে কেন্দ্র ও রাজ্যে একই রাজনৈতিক দলের সরকার থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়েছে। অতীতে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তসলিমা নাসরিনের কলকাতা প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন পর তিনি এমন একটি শহরে ফিরছেন, যেখানে তাঁর সাহিত্যচর্চার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলা সাহিত্য, মুক্তচিন্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। অনেক সাহিত্যপ্রেমীর আশা, এই সফর ভবিষ্যতে আরও মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

প্রায় ২০ বছর পর তসলিমা নাসরিনের কলকাতা সফর নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা। তবে এই ঘটনাকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে। কোন ব্যাখ্যা কতটা গ্রহণযোগ্য, তা পাঠক ও নাগরিকদের নিজস্ব মূল্যায়নের বিষয়।

নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ১ আগস্টের অনুষ্ঠান শুধু একজন লেখিকার প্রত্যাবর্তনের মুহূর্ত নয়; এটি বাংলা সাহিত্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সমাজে মুক্তচিন্তার অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে।