Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমেয়েদের ছবি ও নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুললে কী করবেন?

মেয়েদের ছবি ও নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুললে কী করবেন?

পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বিষয়টি নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও কয়েক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও অ্যাকাউন্টটি সক্রিয় রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই ডিজিটাল সুবিধার আড়ালে বাড়ছে নানা ধরনের সাইবার অপরাধ। বিশেষ করে নারীদের ছবি, নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক আইডি খোলা, অশালীন বার্তা পাঠানো এবং সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনা দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করেও দ্রুত প্রতিকার পাচ্ছেন না। ফলে মানসিক, সামাজিক এবং পারিবারিকভাবে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা।

ভুয়া ফেসবুক আইডির শিকার কিশোরী, বিপর্যস্ত পরিবার

ঢাকার দক্ষিণখান এলাকার এক গৃহিণী, যিনি নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করছেন, জানান তার মাত্র ১২ বছর বয়সী মেয়ের ছবি ব্যবহার করে একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়েছে। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে অশালীন ও ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা পাঠানো হচ্ছে।

পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বিষয়টি নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও কয়েক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও অ্যাকাউন্টটি সক্রিয় রয়েছে।

ভুক্তভোগী মা জানান, তার মেয়ের নিজের কোনো মোবাইল ফোন বা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই। অথচ পরিবারের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি প্রকাশ করলেই সেটি দ্রুত ভুয়া আইডিতে আপলোড করা হয়। এতে মেয়েটির সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং পরিবারটি চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে বাড়ছে সাইবার হয়রানি

বর্তমানে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে নারীদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরির ঘটনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অনেক সময় প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, অশালীন বার্তা আদান-প্রদান, ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়।

শুধু সাধারণ নারীরাই নন, অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তিত্ব, শিক্ষার্থী, এমনকি কিশোরীদের নাম ও ছবি ব্যবহার করেও ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি কী ধরনের অভিযোগ আসে?

বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে অন্যতম হলো—

একই ব্যক্তির নামে একাধিক ফেসবুক আইডি

অনেকের পরিচয় ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। এতে পরিচিতজনরা বিভ্রান্ত হন এবং প্রতারণার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ছবি ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয় তৈরি

নারীদের ছবি সংগ্রহ করে অন্য নামে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। অনেক সময় এসব আইডি ব্যবহার করে অশালীন কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়।

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং

হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট থেকে বন্ধুদের কাছে অর্থ চাওয়া, আপত্তিকর বার্তা পাঠানো কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটছে।

ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণা

অনেক অপরাধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেইল করে থাকে।

থানায় অভিযোগ করলে কী হয়?

কেউ ভুয়া ফেসবুক আইডির শিকার হলে সাধারণত থানায় জিডি বা অভিযোগ করতে পারেন। তবে অভিযোগ করার পরপরই অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করা হয়। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে তা বিভিন্ন প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করে মেটা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।

এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় থানা, পুলিশ সদর দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত সংস্থার অংশগ্রহণ থাকে। ফলে অনেক সময় বিষয়টি নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

কেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন?

সাইবার অপরাধ তদন্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যের নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানির হাতে থাকা।

ফেসবুক বা মেটার সার্ভার এবং ব্যবহারকারীর তথ্য সরাসরি বাংলাদেশ পুলিশের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে কোনো অ্যাকাউন্ট কে খুলেছে, কোথা থেকে পরিচালনা করছে বা কোন ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে—এসব তথ্য জানতে মেটার সহযোগিতা প্রয়োজন হয়।

পুলিশ বলছে, কিছু নির্দিষ্ট অপরাধ যেমন শিশু নির্যাতন, মানবপাচার, সন্ত্রাসবাদ বা পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত অভিযোগে মেটা তুলনামূলক দ্রুত সাড়া দেয়। তবে ভুয়া আইডি, পরিচয় চুরি বা সাধারণ সাইবার হয়রানির ক্ষেত্রে উত্তর পেতে অনেক সময় লাগে।

ভুক্তভোগীরা কেন হতাশ হচ্ছেন?

অনেক নারী অভিযোগ করেছেন, থানায় যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পান না।

ফলে বাধ্য হয়ে তারা পরিচিতজনদের সহায়তায় ভুয়া অ্যাকাউন্টে গণহারে রিপোর্ট করেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রচুর রিপোর্ট পাওয়ার পর অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়, কিন্তু পরে আবার সক্রিয় হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতি ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অপরাধ বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

শুধু ভুয়া আইডি নয়, বরং নারী সেজে প্রতারণা, ভিডিও কল রেকর্ড করে ব্ল্যাকমেইল, শিশুদের টার্গেট করা, পরিচয় চুরি এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল প্রতারণাও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এসব অপরাধ দমন করা কঠিন। কারণ অপরাধী দেশের ভেতরে বা বাইরে যেকোনো স্থান থেকে কাজ করতে পারে।

ভুয়া ফেসবুক আইডি দেখলে কী করবেন?

যদি আপনার ছবি বা নাম ব্যবহার করে কোনো ভুয়া আইডি তৈরি করা হয়, তাহলে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

প্রথমে সেই অ্যাকাউন্টের স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করুন। এরপর ফেসবুকে রিপোর্ট করুন এবং বন্ধুদেরও রিপোর্ট করতে বলুন।

প্রয়োজনে নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি করুন। পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার সহায়তা প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জমা দিতে পারেন।

নিজের ফেসবুক প্রোফাইলের প্রাইভেসি সেটিংস শক্তিশালী করুন এবং ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে সতর্ক থাকুন।

সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি

সাইবার অপরাধের শিকার ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে তাকে সহায়তা করা প্রয়োজন। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর অনুমতি ছাড়াই তার ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করা হয়।

পরিবার, বন্ধু ও সমাজের দায়িত্ব হলো এমন ঘটনার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা।

ফেসবুকে ভুয়া আইডি তৈরি করে নারীদের হয়রানি বর্তমানে একটি গুরুতর সামাজিক ও সাইবার নিরাপত্তা সমস্যা। অভিযোগ করার পরও দ্রুত প্রতিকার না পাওয়ার কারণে অনেক ভুক্তভোগী দীর্ঘদিন ভোগান্তিতে থাকেন। তবে সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রিপোর্টিং, আইনি সহায়তা গ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

ডিজিটাল যুগে নিজের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা যেমন জরুরি, তেমনি ভুয়া আইডির বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াও সময়ের দাবি।