বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে এ শিল্প দেশের লাখো মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। তবে বিদ্যুৎ, গ্যাস, অবকাঠামো এবং নীতিগত জটিলতার মতো বিভিন্ন সমস্যার কারণে শিল্পটির স্বাভাবিক অগ্রযাত্রা অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দ্রুত দূর করে পোশাক শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। বৈঠকে দেশের তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান অবস্থা, বিভিন্ন সংকট এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, বৈঠকে বিজিএমইএর নেতারা শিল্পের নানা বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়।
বিজিএমইএর প্রতিনিধি দল জানায়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রতিনিধিরা শিল্পের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কয়েকটি সুপারিশও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি আয় আরও বাড়বে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার পর প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, পোশাক শিল্পের অগ্রগতির পথে যেসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কিছু সমস্যার সমাধানে সময় লাগলেও সরকার সেগুলো সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে পোশাক শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ শুরু করেছে। তিনি বলেন, সব সমস্যা একদিনে সমাধান সম্ভব নয়, তবে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে সংকট দূর করা হবে।
তার ভাষায়, যেসব সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব, সেগুলোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিলম্ব করা হবে না। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নীতিগত সংস্কারেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে শক্তিশালী শিল্পখাতের বিকল্প নেই। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে তৈরি পোশাক শিল্প সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তিনি জানান, আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে। এতে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে একটি ব্যবসাবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করেছে। শিল্পের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
তিনি ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশে বলেন, সরকার জনগণের পাশাপাশি দেশের উদ্যোক্তাদের সমস্যার সমাধানেও সমানভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিল্পের বিকাশে যা যা প্রয়োজন, সরকার তা বাস্তবায়নে কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় বিজিএমইএর সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, পোশাক শিল্পের উন্নয়ন নিশ্চিত হলে দেশের শিল্পায়নও নতুন গতি পাবে এবং দেশের বাহিরের বাজারে আরও সুসংহত হবে বাংলাদেশের অবস্থান।
বৈঠকে বিজিএমইএর প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। বৈঠক শেষে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে সম্মাননা স্মারক (ক্রেস্ট) তুলে দেওয়া হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শ্রম উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন এবং বিজিএমইএর অন্যান্য শীর্ষ নেতারা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর নীতি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক নির্দেশনা শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দ্রুত দূর করা গেলে দেশের রপ্তানি আয় আরও বাড়বে, নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করতে সক্ষম হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আরও বড় অবদান রাখবে।

