খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের আপত্তিতে বাতিল বিতর্কিত বৈঠক

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের আপত্তির মুখে একটি বিতর্কিত বৈঠক শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।...
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালদেশজুড়েকক্সবাজারে পাহাড়ধসে ১৭ জনের মৃত্যু, এখনও ঝুঁকিতে ২ লাখ মানুষ

কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ১৭ জনের মৃত্যু, এখনও ঝুঁকিতে ২ লাখ মানুষ

বন্যার পানিতে ডুবে গেছে বহু বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে

কক্সবাজারে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা এবং বন্যার কারণে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত। এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জনই উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা। এছাড়া কক্সবাজার সদর ও চকরিয়ায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় এখনও দুই লাখের বেশি মানুষ চরম ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন এলাকায় দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। আবহাওয়া পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত চার দিনের টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, ঈদগাঁও এবং মাতামুহুরী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

বন্যার পানিতে ডুবে গেছে বহু বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে চকরিয়া ও পেকুয়ার রাজাখালী, মগনামা এবং উজানটিয়া ইউনিয়নের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি মাছের ঘেরে পানি আটকে থাকায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, অবিরাম বৃষ্টির কারণে জেলার পাহাড়ি এলাকাগুলোর মাটি অত্যন্ত নরম হয়ে গেছে। ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, মহেশখালী এবং পেকুয়ার পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় বসবাসকারী অন্তত দুই লাখ মানুষ এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। পাহাড়ের ঢালে নির্মিত হাজারো আশ্রয়কেন্দ্র অতিবৃষ্টির কারণে অস্থির হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে জেলার বহু গ্রামীণ সড়ক ও উপসড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের ওপর পানি উঠে যাওয়ায় সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথেও সব ধরনের নৌযান চলাচল স্থগিত রয়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় জরুরি সেবা এবং ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর যৌথভাবে প্রস্তুতি জোরদার করেছে।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, উদ্ধার সরঞ্জাম মজুত, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে।

কক্সবাজার শহরের কলাতলী হাজীপাড়াসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চালালেও অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে যেতে রাজি হচ্ছেন না।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, বারবার অনুরোধ এবং প্রচারণা চালানো হলেও অনেক মানুষ পাহাড়ের ঢালেই অবস্থান করছেন। এতে সম্ভাব্য প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।

উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের সোনারপাড়ার বাসিন্দারা জানান, টানা বৃষ্টির কারণে রাতভর তারা আতঙ্কের মধ্যে থাকছেন। ছোট শিশুদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতা তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

কক্সবাজার শহরের পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীরাও একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হলে অনেক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হবে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারে প্রতি বছর পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ার পেছনে রয়েছে পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণ।

তাদের মতে, শুধুমাত্র দুর্যোগের সময় সাময়িক ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পাহাড় সংরক্ষণ, বনায়ন বৃদ্ধি এবং অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছর একই ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু এখনও সক্রিয় রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

এর ফলে পাহাড়ধস, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুসরণ করে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, উদ্ধারকারী দল সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা কিংবা অন্য যেকোনো দুর্যোগের খবর পাওয়া মাত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সবাইকে অনুরোধ করেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল কিংবা পাদদেশে অবস্থান না করে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রশাসন বা ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়ে থাকা পরিবারগুলোকে প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।

ক্যাম্প এলাকায় পাহাড়ধসের সম্ভাবনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।