ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে উত্তেজনা, বিতর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রচারণা। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা দুর্দান্ত ছন্দে টুর্নামেন্টে এগিয়ে চললেও, তাদের ঘিরে বিতর্কেরও শেষ নেই। বিশেষ করে রেফারিং এবং ফিফার পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে অনলাইনে শুরু হয়েছে একটি আলোচিত ক্যাম্পেইন—‘আর্জেন্টিনা আউট’। ইতোমধ্যেই এই প্রচারণায় ১ কোটিরও বেশি ভোট পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই কোনো না কোনো দলকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। ২০২৬ সালেও তার ব্যতিক্রম নয়। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক সাফল্য যেমন সমর্থকদের উচ্ছ্বসিত করেছে, তেমনি প্রতিপক্ষ সমর্থকদের একাংশের মধ্যে জন্ম দিয়েছে প্রশ্ন।
অনেক ফুটবলপ্রেমীর অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনা বারবার বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সুবিধা পাচ্ছে। রেফারির সিদ্ধান্ত, ভিএআর ব্যবহারের ধরন এবং পেনাল্টি সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি এবং ফিফাও এ ধরনের অভিযোগ গ্রহণ করেনি।
কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ চলাকালেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, লিওনেল মেসিকে বিশ্বকাপ জেতানোর জন্য নাকি পুরো টুর্নামেন্ট পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়েছে। এমনকি সমালোচকদের একটি অংশ মেসিকে বিদ্রূপ করে ‘পেসি’ বলেও উল্লেখ করেছিল।
তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাদের মতে, মাঠের পারফরম্যান্সই আর্জেন্টিনার সাফল্যের প্রধান কারণ।
বিতর্ক থাকলেও মাঠের খেলায় আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। দলটি ধারাবাহিকভাবে জয় তুলে নিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে।
লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, হুলিয়ান আলভারেজসহ পুরো দলই দারুণ ছন্দে রয়েছে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তরুণদের সমন্বয় আর্জেন্টিনাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। ফলে অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞই তাদের অন্যতম শিরোপা দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করছেন।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ‘আর্জেন্টিনা আউট’ ক্যাম্পেইনের মূল দাবি হলো, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ক্যাম্পেইনের সমর্থকদের ভাষ্য, এতে অন্যান্য দল সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তবে উল্লেখ করা জরুরি যে, এটি কোনো সরকারি বা ফিফা-স্বীকৃত উদ্যোগ নয়। এটি সম্পূর্ণরূপে একটি অনলাইন ফ্যান-নির্ভর প্রচারণা। ক্যাম্পেইনে প্রদর্শিত ভোটসংখ্যাও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।
প্রচারণার ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে ১ কোটিরও বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন।
তবে এই সংখ্যার সত্যতা স্বাধীন কোনো সংস্থা বা ফিফা নিশ্চিত করেনি। অনলাইন ক্যাম্পেইনে ভোটের সংখ্যা অনেক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে বা একই ব্যক্তি একাধিকবার অংশ নিতে পারেন। তাই প্রদর্শিত সংখ্যাকে চূড়ান্ত বা সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
এই প্রচারণায় অংশ নিতে আগ্রহীরা সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পেইনের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করছেন। সেখানে ‘Vote Argentina Out’ বা অনুরূপ একটি বোতামে ক্লিক করেই ভোট দেওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে সতর্ক থাকা উচিত। অজানা ওয়েবসাইটে প্রবেশ বা তথ্য প্রদান করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা যাচাই করা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ।
সমালোচনা যতই থাকুক, বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা কমেনি। লিওনেল মেসির বিশাল ভক্তগোষ্ঠী এখনও দলটির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছে।
অন্যদিকে প্রতিপক্ষ সমর্থকদের একটি অংশ আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছেন এবং বিতর্কিত মুহূর্তগুলো সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল করছেন। ফলে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে আলোচনা বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
এ পর্যন্ত ফিফা আর্জেন্টিনাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায়নি। টুর্নামেন্টের সব ম্যাচই নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে বলে সংস্থাটি ধারাবাহিকভাবে জানিয়ে আসছে।
রেফারিং সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টেই এমন অভিযোগ দেখা যায়। তবে আনুষ্ঠানিক তদন্ত ছাড়া কোনো দাবিকে সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
‘আর্জেন্টিনা আউট’ ক্যাম্পেইন বিশ্বকাপ ২০২৬-এর অন্যতম আলোচিত অনলাইন ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। ১ কোটির বেশি ভোট পড়ার দাবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও, এটি কোনো সরকারি গণভোট বা ফিফা-স্বীকৃত উদ্যোগ নয়। ফলে এ ধরনের প্রচারণাকে মূলত ভক্তদের মতামত প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবেই দেখা উচিত।
অন্যদিকে মাঠের খেলায় আর্জেন্টিনা এখনও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে এবং শিরোপা ধরে রাখার অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ভাগ্য নির্ধারণ করবে মাঠের পারফরম্যান্সই—অনলাইন প্রচারণা নয়।

