ইংল্যান্ডের নাম শুনলেই ভারতের মানুষের মনে প্রথমেই ফিরে আসে ব্রিটিশ শাসনের দীর্ঘ ও বেদনাময় ইতিহাস। প্রায় দুই শতাব্দীর ঔপনিবেশিক শাসন শুধু ভারতকেই নয়, বিশ্বের বহু দেশকে গভীর ক্ষতের স্মৃতি দিয়ে গেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার একসময় পৃথিবীর নানা প্রান্তে আধিপত্য কায়েম করেছিল। সেই কারণেই ইংল্যান্ডকে অনেকের কাছে এখনও কঠোর ও নির্মম শাসকের দেশ হিসেবে দেখা হয়।
তবে ইতিহাসের ভার যতই গভীর হোক, বর্তমানের বাস্তবতা অনেকটাই বদলেছে। আধুনিক ইংল্যান্ডের ক্রীড়াবিদরা, বিশেষ করে জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা, গত প্রায় দুই দশক ধরে এমন এক মানবিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ডেভিড বেকহ্যাম, গ্যারি নেভিল, স্টিভেন জেরার্ড, ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড থেকে শুরু করে হ্যারি কেন, বুকায়ো সাকা এবং জুড বেলিংহ্যাম—প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধের সেই ধারা আজও অটুট রয়েছে।
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের প্রতিটি ম্যাচ ঘিরে যেমন ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা থাকে, তেমনই অনেক সময় ইতিহাসও নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ম্যাচ মানেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের প্রসঙ্গ সামনে আসে।
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ এখনও দুই দেশের সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই যুদ্ধ বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল এবং দুই দেশের মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু এই রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের আরেকটি গল্পও সমানভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে—একটি গল্প, যেখানে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি রয়েছে মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা।
২০০৭ সালে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের কয়েকজন সিনিয়র ফুটবলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের উপলব্ধি ছিল, জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারাটাই সবচেয়ে বড় সম্মান। সেই সম্মানকে আর্থিক লাভের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়।
এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় England Footballers Foundation। সেই সময় দলে ছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম, জন টেরি, স্টিভেন জেরার্ড, ওয়েন রুনি, মাইকেল ওয়েন, গ্যারি নেভিল এবং ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলাররা।
তাঁরা একমত হন যে, জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য যে ম্যাচ ফি দেওয়া হয়, সেই অর্থ ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করবেন না। বরং পুরো অর্থ সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হবে।
এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রতীকী ছিল না; বরং দীর্ঘমেয়াদি একটি সামাজিক উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের মতে, দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগই সবচেয়ে বড় পুরস্কার। তাই ম্যাচ ফি ত্যাগ করা তাঁদের কাছে কোনও আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং দেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি উপায়।
ফলে জাতীয় দলের প্রতিটি ম্যাচের পারিশ্রমিক সরাসরি জমা হতে থাকে ফুটবলার্স ফাউন্ডেশনের তহবিলে। এই উদ্যোগে দলের একজন সদস্যও ব্যতিক্রম হননি।
বছরের পর বছর ধরে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রাও একই নীতি অনুসরণ করেছেন। এতে প্রমাণ হয়েছে, এটি কোনও ব্যক্তিগত প্রচার নয়; বরং জাতীয় দলের সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
ডেভিড বেকহ্যামদের সময় যে উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল, সেটি আজও অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে হ্যারি কেন, বুকায়ো সাকা, জুড বেলিংহ্যাম, ডেকলান রাইস, মার্কাস র্যাশফোর্ডসহ নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররাও একই নীতি অনুসরণ করছেন।
গত প্রায় দুই দশকে প্রায় ১৩৫ জনের বেশি ফুটবলার ইংল্যান্ডের জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছেন। কেউ বিশ্বসেরা হয়েছেন, কেউ আবার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। কিন্তু সমাজসেবার প্রশ্নে সবাই একই সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন।
এই ধারাবাহিকতাই ইংল্যান্ড ফুটবল দলের অন্যতম বিশেষ পরিচয় হয়ে উঠেছে।
ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের এই উদ্যোগ শুধু প্রতীকী নয়; এর বাস্তব প্রভাবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাচ ফি থেকে জমা হওয়া অর্থ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সমাজকল্যাণমূলক সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
- ইউনিসেফ (UNICEF)
- Help for Heroes
- Bobby Moore Fund
- শিশু, স্বাস্থ্য ও যুদ্ধাহতদের সহায়তায় কাজ করা আরও একাধিক সংস্থা
গত প্রায় ২০ বছরে ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ পাউন্ড দান করেছেন। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৯৪ কোটি টাকা।
এই অর্থ অসংখ্য শিশু, অসহায় পরিবার, যুদ্ধাহত সেনা এবং স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে।
বর্তমান সময়ে অনেক সমাজসেবামূলক উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। কিন্তু ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের এই উদ্যোগ দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের নজরের বাইরে ছিল।
বিশ্বকাপ চলাকালীন বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে আলোচনায় আসে। তখনই অনেকেই জানতে পারেন, ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা বছরের পর বছর নিজেদের ম্যাচ ফি দান করে আসছেন।
এটি দেখায় যে, প্রকৃত সমাজসেবা সবসময় প্রচারের জন্য করা হয় না। অনেক সময় নীরব কাজই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস কখনও মুছে যাবে না। ভারতসহ বহু দেশের মানুষের স্মৃতিতে সেই অধ্যায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। ইতিহাসের অন্যায়কে অস্বীকার করারও কোনও সুযোগ নেই।
তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য, অতীতের দায় বর্তমান প্রজন্মের প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত দায় নয়। আজকের ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা তাঁদের কাজের মাধ্যমে সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং সহমর্মিতার পরিচয় দিচ্ছেন।
তাঁদের এই উদ্যোগ হয়তো ইতিহাসের ক্ষত মুছে দিতে পারবে না, কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম। এটি দেখায়, একজন ক্রীড়াবিদ শুধু মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই নয়, সমাজের জন্য কাজ করেও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেন।
ডেভিড বেকহ্যাম থেকে হ্যারি কেন, স্টিভেন জেরার্ড থেকে বুকায়ো সাকা—প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু ইংল্যান্ডের জাতীয় ফুটবল দলের একটি মূল্যবোধ অপরিবর্তিত রয়েছে। দেশের জার্সিকে অর্থের চেয়ে বড় সম্মান হিসেবে দেখা এবং সেই অর্থ সমাজের কল্যাণে ব্যয় করার যে সংস্কৃতি ২০০৭ সালে শুরু হয়েছিল, তা আজও সমানভাবে বহমান।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাস যতই বিতর্কিত হোক না কেন, আধুনিক ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা তাঁদের মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এক ভিন্ন পরিচয় তুলে ধরছেন। তাঁদের এই নীরব আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, খেলাধুলা শুধু জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়; এটি সমাজকে বদলে দেওয়ারও এক শক্তিশালী মাধ্যম।

