Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeবিশ্ব সংবাদওয়েস্ট বেঙ্গলসীমান্তে ফেরা মানুষের গল্প: ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত, জেরা, অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার...

সীমান্তে ফেরা মানুষের গল্প: ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত, জেরা, অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার বাস্তবতা

ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার চেষ্টায় সীমান্ত এলাকাগুলো এখন যেন এক নতুন বাস্তবতার সাক্ষী। প্রতিদিনই বাড়ছে সেইসব মানুষের সংখ্যা, যারা একসময় অবৈধভাবে ভারতে গিয়েছিলেন, আর এখন আবার নিজের দেশে ফিরতে চাইছেন। বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত অঞ্চল এখন এই মানবস্রোতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা দিয়েছেন—যারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চান, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হবে না। কিন্তু এই ঘোষণার আগেই অনেকেই সীমান্তে এসে জড়ো হতে শুরু করেছিলেন। তাদের চোখে এক ধরনের ভয়, আবার অন্যদিকে নিজের দেশে ফেরার এক অদ্ভুত স্বস্তির আশা।

এই সীমান্তেই দেখা মেলে বাচ্চু মুন্সির মতো মানুষের। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের হাত ধরে তিনি ভারতে পাড়ি দিয়েছিলেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। প্রায় ৩৮ বছর কেটে গেছে—সেখানে তিনি সংসার গড়েছেন, সন্তানদের বড় করেছেন, এমনকি তাদের বিয়েও দিয়েছেন।

কিন্তু এখন সবকিছু ছেড়ে আবার ফিরে আসতে হচ্ছে জন্মভূমিতে। ভাবুন তো, একটা জায়গায় পুরো জীবন কাটিয়ে হঠাৎ করে সব ছেড়ে চলে আসা—এটা কতটা কঠিন!

বাচ্চু মুন্সির মতো আরও অনেকেই রয়েছেন, যারা যশোর, খুলনা বা সাতক্ষীরা থেকে ভারতে গিয়েছিলেন। কেউ গিয়েছেন কয়েক বছর আগে, আবার কেউ কয়েক দশক আগে। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে এখন সবাই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর থেকেই বলা হচ্ছে—অবৈধভাবে থাকা বাংলাদেশিদের আর থাকতে দেওয়া হবে না।

এই ঘোষণার প্রভাব সরাসরি পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। যারা এতদিন চুপচাপ বসবাস করছিলেন, তারা হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছেন। অনেকেই বলছেন, তারা বুঝে গেছেন—এখন আর সেখানে থাকা সম্ভব নয়।

এই অবস্থায় অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ঝুঁকি না নিয়ে নিজের দেশে ফিরে যাওয়াই ভালো।

সীমান্তে গেলে পুরো প্রক্রিয়াটা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যারা ফেরার জন্য আসছেন, তাদের প্রথমে একটি পরিত্যক্ত ঘরে অপেক্ষা করতে বলা হয়। এরপর একে একে ডাকা হয়, এবং শুরু হয় নথি যাচাই।

তাদের নাম, পরিচয়, বাংলাদেশের ঠিকানা—সব কিছু খুঁটিয়ে লেখা হয়। এমনকি ছবি তোলাও হয়। পুরো প্রক্রিয়াটা অনেকটা আনুষ্ঠানিক জেরার মতো মনে হয়।

তারপর তাদের আবার অপেক্ষা করতে হয় সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায়। এই অপেক্ষা কখনো কয়েক ঘণ্টা, আবার কখনো পুরো দিনও হয়ে যায়।

স্থানীয়দের মতে, সব যাচাই শেষে তাদের সীমান্তের নির্দিষ্ট পথ দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। অনেক সময় রাত হয়ে যায়, কারণ প্রতিটি মানুষের তথ্য যাচাই করতে সময় লাগে।

সেদিনই সবাইকে সীমান্ত পার করা হয় না। অনেক সময় তাদের বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় হোল্ডিং সেন্টারে, যেখানে অস্থায়ীভাবে রাখা হয়।

এই সময়টা সবচেয়ে কঠিন। কারণ কেউ জানে না, ঠিক কখন তারা নিজের দেশে ফিরতে পারবে। এক ধরনের অনিশ্চয়তা আর মানসিক চাপ কাজ করে সবার মধ্যে।

অদ্ভুত বিষয় হলো—অনেকের কাছেই ভারতের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। কারও ভোটার আইডি, কারও আধার কার্ড, আবার কারও প্যান কার্ডও আছে।

তাহলে প্রশ্ন আসে—এতদিন তারা কীভাবে বসবাস করছিলেন?

অনেকেই বলছেন, তারা নিয়ম মেনেই সব কাগজপত্র করেছিলেন। এমনকি ভোটও দিয়েছেন। কিন্তু নতুন করে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় অনেকের নাম বাদ পড়ে গেছে।

এই একটি কারণই অনেকের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

সীমান্তে আসা অনেকেই বলছেন, শুধু সরকারি ঘোষণা নয়—স্থানীয় পরিস্থিতিও তাদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

পুলিশের কড়াকড়ি বেড়েছে, বাড়িওয়ালারা আর রাখতে চাইছেন না। ফলে এক ধরনের সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছে।

ভাবুন, আপনি যেখানে থাকছেন, হঠাৎ করে সবাই বলতে শুরু করল—আপনি এখানে থাকতে পারবেন না। তখন আর উপায় থাকে না, চলে যাওয়া ছাড়া।

অনেকেই বলছেন, তারা “স্বেচ্ছায়” ফিরছেন। কিন্তু কথার মধ্যে বোঝা যায়, এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নিজের নয়। পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করেছে।

নাজমার মতো অনেক নারী বলছেন, “থাকার কোনো সুযোগ নেই, তাই চলে যাচ্ছি।”

রাইসা পারভিনের কথায়, “পরিবারের সবাই আগেই চলে গেছে, এখন আমাদেরও যেতে হচ্ছে।”

এই গল্পগুলো শুনলে বোঝা যায়—এটা শুধু স্থান পরিবর্তন নয়, এটা একটা জীবনের অধ্যায় শেষ হয়ে যাওয়া।

যারা ফিরে যাচ্ছেন, তাদের সবার মনেই একটা প্রশ্ন—এখন কী হবে?

অনেকে বলছেন, দেশে গিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করবেন। কেউ ভাবছেন ছোট ব্যবসা করবেন, কেউবা কৃষিকাজে ফিরবেন।

আবার কেউ কেউ বলছেন, ভবিষ্যতে যদি কখনো ভারতে আসেন, তাহলে বৈধ পথে আসবেন—পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে।

এই কথাগুলোতে একটা আশা আছে, কিন্তু সেই সাথে একটা ভয়ও লুকিয়ে আছে—সবকিছু কি সত্যিই নতুন করে শুরু করা যাবে?

এই পুরো ঘটনাটার সবচেয়ে বড় দিক হলো—মানুষের গল্প।

এরা কেউ অপরাধী নয়, বরং জীবনের প্রয়োজনে এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়েছিলেন। এখন আবার পরিস্থিতির কারণে ফিরে আসছেন।

তাদের চোখে আপনি ভয় দেখবেন, কিন্তু একই সাথে একটা আশাও দেখবেন—নিজের দেশে ফিরে নতুনভাবে বাঁচার আশা।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এখন শুধু একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

যারা ফিরে আসছেন, তাদের জন্য এটি যেমন কষ্টের, তেমনি নতুন করে শুরু করার একটি সুযোগও।

জীবন কখনো সহজ নয়। কিন্তু মানুষ সবসময়ই নতুনভাবে বাঁচার পথ খুঁজে নেয়। সীমান্ত পেরিয়ে এই ফেরার গল্পগুলো সেই অদম্য মানসিকতারই প্রমাণ।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।