খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশসাঁতার নয়, সমুদ্রের তলায় হাঁটে যে মাছ! পৃথিবীতে বেঁচে আছে ২৫০টিরও কম

সাঁতার নয়, সমুদ্রের তলায় হাঁটে যে মাছ! পৃথিবীতে বেঁচে আছে ২৫০টিরও কম

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, একটি রেড হ্যান্ডফিশ এক বছরে যে পরিমাণ এলাকা অতিক্রম করতে পারে, তা মোটামুটি একটি সাধারণ বাস্কেটবল কোর্টের দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি। অর্থাৎ, বছরের পর বছর একই ছোট এলাকায় অবস্থান করাই তার স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ।

সমুদ্রের গভীরে এমন অনেক প্রাণী রয়েছে, যাদের চেহারা ও জীবনযাপন দেখে অবাক হতে হয়। তবে তাদের মধ্যে রেড হ্যান্ডফিশ যেন একটু বেশিই ব্যতিক্রমী। এটি দেখতে মাছের মতো হলেও সাধারণ মাছের মতো সাঁতার কেটে চলাফেরা করে না। বরং সমুদ্রের তলদেশে থাকা পাথর ও বালুর ওপর ছোট ছোট পাখনার সাহায্যে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায়।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীতে এখন এই অদ্ভুত মাছের সংখ্যা ২৫০টিরও কম বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে রেড হ্যান্ডফিশ শুধু বিচিত্র একটি সামুদ্রিক প্রাণী নয়, একই সঙ্গে এটি বিশ্বের অন্যতম বিপন্ন মাছের প্রজাতি হিসেবেও পরিচিত।

রেড হ্যান্ডফিশের আকার খুবই ছোট। একটি পূর্ণবয়স্ক মাছের দৈর্ঘ্য অনেক সময় মানুষের বুড়ো আঙুলের কাছাকাছি হতে পারে। ছোট্ট শরীরের সঙ্গে এর চেহারায় রয়েছে বেশ কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য, যা অন্য মাছের থেকে তাকে সহজেই আলাদা করে।

মাথার ওপর খাড়া পাখনা দেখা যায়। মুখের আশপাশে থাকে উজ্জ্বল লালচে রং। তার ওপর মুখের গঠন এমন যে, দেখলে মনে হতে পারে মাছটি যেন সবসময় বিরক্ত হয়ে আছে। এই অদ্ভুত চেহারার কারণেই রেড হ্যান্ডফিশ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের আলোচনায় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

তবে এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য মুখ বা রং নয়। আসল বিস্ময় লুকিয়ে রয়েছে এর পাখনায়।

সাধারণ মাছের ক্ষেত্রে পাখনা মূলত সাঁতার কাটা এবং পানির মধ্যে দিক পরিবর্তনের কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু রেড হ্যান্ডফিশের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা।

এর শরীরের দুই পাশে থাকা বুকের পাখনাগুলো বিবর্তনের ফলে অনেকটা ছোট হাতের মতো আকৃতি পেয়েছে। এই পাখনাগুলো ব্যবহার করেই মাছটি সমুদ্রের তলদেশে ভর দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়।

অর্থাৎ, অন্য মাছ যেখানে পানির মধ্যে সাঁতার কেটে চলাফেরা করে, রেড হ্যান্ডফিশ সেখানে সমুদ্রের মাটির ওপর দিয়ে অনেকটা হাঁটার মতো করে এগোয়। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য থেকেই এসেছে ‘হ্যান্ডফিশ’ নামটি।

অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশবিষয়ক কর্তৃপক্ষও রেড হ্যান্ডফিশের হাতের মতো পরিবর্তিত পাখনাকে প্রজাতিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে।

রেড হ্যান্ডফিশ শুধু হাঁটেই না, হাঁটে অত্যন্ত ধীর গতিতে। পানির মধ্যে দ্রুত সাঁতার কেটে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার ক্ষমতা এই মাছের নেই বললেই চলে।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, একটি রেড হ্যান্ডফিশ এক বছরে যে পরিমাণ এলাকা অতিক্রম করতে পারে, তা মোটামুটি একটি সাধারণ বাস্কেটবল কোর্টের দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি। অর্থাৎ, বছরের পর বছর একই ছোট এলাকায় অবস্থান করাই তার স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ।

এই সীমিত চলাফেরার কারণে রেড হ্যান্ডফিশের জন্য নির্দিষ্ট সামুদ্রিক আবাসস্থল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই আবাসস্থলে সামান্য পরিবর্তন ঘটলেও প্রজাতিটির ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

রেড হ্যান্ডফিশের বসবাসের এলাকা অত্যন্ত সীমিত। অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের নির্দিষ্ট কিছু সামুদ্রিক অঞ্চলে এই মাছের দেখা মেলে।

সাধারণত সমুদ্রের তলদেশে পাথুরে রিফ বা পাথরের কাছাকাছি এলাকায় তারা বসবাস করে। নিজেদের পরিচিত ছোট আবাসস্থলের মধ্যেই খাবার খোঁজা, বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রজননের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে।

বিশ্বের অন্য অনেক সামুদ্রিক প্রাণীর মতো বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা রেড হ্যান্ডফিশের নেই। ফলে যে সামুদ্রিক পরিবেশে তারা বাস করে, সেটি নষ্ট হয়ে গেলে অন্য জায়গায় গিয়ে সহজে নতুন আবাস তৈরি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

রেড হ্যান্ডফিশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এর সংখ্যা। ২০২৬ সালের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক পরিবেশে বর্তমানে ২৫০টিরও কম রেড হ্যান্ডফিশ বেঁচে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংখ্যাটা কতটা কম, তা বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়। একটি ছোট স্কুলের শ্রেণিকক্ষে যতজন শিক্ষার্থী থাকে, তার কাছাকাছি সংখ্যক রেড হ্যান্ডফিশ নিয়েই হয়তো পৃথিবীতে এই প্রজাতির বর্তমান অস্তিত্ব টিকে রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় তাই রেড হ্যান্ডফিশকে চরম বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের সংখ্যা এত কম যে একটি বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তন পুরো প্রজাতিটির ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

রেড হ্যান্ডফিশের অস্তিত্ব সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হলো সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়লে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রেও পরিবর্তন আসে। তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনও অনেক সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য, প্রজনন ও বসবাসের পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।

এর পাশাপাশি সমুদ্রদূষণও রেড হ্যান্ডফিশের জন্য বড় হুমকি। প্লাস্টিক, রাসায়নিক বর্জ্য এবং অন্যান্য দূষণকারী পদার্থ সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। একই সঙ্গে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আরেকটি সমস্যা হলো আক্রমণাত্মক বহিরাগত প্রজাতি। কোনো নতুন প্রজাতি একটি সামুদ্রিক পরিবেশে ঢুকে পড়লে খাবার ও জায়গার জন্য প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। এর ফলে স্থানীয় ও দুর্বল প্রজাতিগুলো আরও বেশি চাপের মুখে পড়ে।

রেড হ্যান্ডফিশের গল্প আসলে শুধু একটি অদ্ভুত মাছের গল্প নয়। এটি সমুদ্রের পরিবেশ কতটা ভঙ্গুর হয়ে উঠছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

একদিকে এই মাছের পাখনা হাতের মতো, অন্যদিকে তার চলাফেরা হাঁটার মতো। এমন বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি প্রকৃতির অসাধারণ বিবর্তনের একটি উদাহরণ। কিন্তু একই সময়ে মানুষের কর্মকাণ্ড ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে সেই অসাধারণ প্রাণীটিই আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

রেড হ্যান্ডফিশের সংখ্যা যদি আরও কমতে থাকে, তাহলে একসময় হয়তো এই মাছকে শুধু ছবি বা গবেষণার বইতেই দেখা যাবে। তাই সমুদ্রের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, দূষণ কমানো, সামুদ্রিক আবাসস্থল রক্ষা এবং ক্ষতিকর বহিরাগত প্রজাতির বিস্তার ঠেকানো—সবকিছুই এই ছোট্ট মাছটির ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকৃতির সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণীগুলোর অনেকগুলোর অস্তিত্বই নির্ভর করে খুব ছোট একটি আবাসস্থলের ওপর। রেড হ্যান্ডফিশ তারই এক জীবন্ত উদাহরণ। আকারে বুড়ো আঙুলের কাছাকাছি হলেও এই মাছ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্ব কতটা বড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ