খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeসাইটেকসূর্যের গায়ে সমুদ্রের ঢেউ! ২০ কিমির প্লাজমা ঘূর্ণি দেখে অবাক বিজ্ঞানীরা

সূর্যের গায়ে সমুদ্রের ঢেউ! ২০ কিমির প্লাজমা ঘূর্ণি দেখে অবাক বিজ্ঞানীরা

সূর্যের প্লাজমার এই ক্ষুদ্র ঘূর্ণিগুলো দেখতে পৃথিবীর পরিচিত কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। সমুদ্রের পানিতে ঢেউ ভাঙার সময় যেমন ছোট ছোট পাক তৈরি হয়, সূর্যের প্লাজমাতেও তেমন ঘূর্ণায়মান গঠন তৈরি হতে পারে।

পৃথিবী থেকে রাতের আকাশে বা দিনের আলোয় সূর্যের দিকে তাকালে তাকে মনে হয় বিশাল এক উজ্জ্বল ও শান্ত গোলক। কিন্তু এই চেহারার আড়ালে সূর্যের পৃষ্ঠে যে ভয়াবহ অস্থিরতা চলছে, তা এবার আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছে বিজ্ঞানীদের ক্যামেরায়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর পর্যবেক্ষণ যন্ত্রগুলোর একটি সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠে এমন ক্ষুদ্র প্লাজমা ঘূর্ণির ছবি তুলেছে, যা দেখে অবাক গবেষকরাও।

সূর্যের গায়ে তৈরি হওয়া এই গঠনগুলো দেখতে অনেকটা সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে যাওয়ার সময় তৈরি হওয়া পাক বা ঘূর্ণির মতো। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এগুলোর কিছুটির আকার মাত্র প্রায় ২০ কিলোমিটার। মহাকাশের বিশালত্বের তুলনায় এটি অত্যন্ত ছোট। অথচ এই ক্ষুদ্র গঠনই সূর্যের পৃষ্ঠের জটিল চৌম্বকীয় পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।

সূর্যকে স্থির মনে হলেও তার দৃশ্যমান পৃষ্ঠ মোটেই শান্ত নয়। সেখানে প্রতিনিয়ত উত্তপ্ত প্লাজমার ওঠানামা চলছে। সূর্যের গভীর অংশ থেকে উত্তপ্ত পদার্থ উপরের দিকে উঠে আসে। পরে কিছুটা ঠান্ডা হলে তা আবার নিচের দিকে নেমে যায়।

এই ক্রমাগত ওঠানামার কারণে সূর্যের পৃষ্ঠে তৈরি হয় অসংখ্য ক্ষুদ্র ও বৃহৎ গঠন। অনেকটা ফুটন্ত পানির পাত্রের মতোই সূর্যের পৃষ্ঠে সবসময় চলছে প্রবল আলোড়ন।

তবে পৃথিবী থেকে এত দূরে থাকা সূর্যের মাত্র কয়েক দশ কিলোমিটার আকারের গঠন শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। নতুন পর্যবেক্ষণ সেই সীমাবদ্ধতাকেই অনেকটা অতিক্রম করেছে।

আরও পড়ুন :  পৃথিবীর একমাত্র সাগর যার কোনো কূল নেই! সারগাসো সাগরের অবিশ্বাস্য রহস্য

গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে আমেরিকার ইনোয়ে সোলার টেলিস্কোপ। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর টেলিস্কোপ হিসেবে পরিচিত। সূর্যের পৃষ্ঠের অত্যন্ত সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি এই শক্তিশালী যন্ত্রের ধারাবাহিক ছবিতেই ক্ষুদ্র প্লাজমা ঘূর্ণিগুলো ধরা পড়েছে।

ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের চৌম্বকীয় অঞ্চলগুলোর আশপাশে অসংখ্য সূক্ষ্ম ঘূর্ণি ও ডোরার মতো গঠন দেখতে পেয়েছেন।

এই গঠনগুলোর কিছু এতটাই ছোট যে পৃথিবী থেকে এগুলো শনাক্ত করা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত কঠিন। ফলে এই পর্যবেক্ষণ শুধু সূর্যের নতুন একটি দৃশ্য দেখায়নি, বরং সৌর পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি কতটা উন্নত হয়েছে, সেটিও সামনে এনেছে।

সূর্যের প্লাজমার এই ক্ষুদ্র ঘূর্ণিগুলো দেখতে পৃথিবীর পরিচিত কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। সমুদ্রের পানিতে ঢেউ ভাঙার সময় যেমন ছোট ছোট পাক তৈরি হয়, সূর্যের প্লাজমাতেও তেমন ঘূর্ণায়মান গঠন তৈরি হতে পারে।

অবশ্য সূর্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক বেশি চরম। কারণ সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠে পদার্থ মূলত অত্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমা অবস্থায় থাকে। একই সঙ্গে সেখানে শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্রও সক্রিয় থাকে।

ফলে এই ঘূর্ণিগুলো কেবল তরলের সাধারণ ঢেউ নয়। এগুলোর পেছনে প্লাজমার গতি, তাপমাত্রা এবং সূর্যের চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের জটিল পারস্পরিক ক্রিয়া কাজ করে।

আরও পড়ুন :  লিওনেল মেসিকে থামানোর রহস্য ফাঁস! যেসব কৌশলে সফল হয়েছিলেন কিংবদন্তি কোচরা

মহাকাশে ঘূর্ণি বা পাক খাওয়া গঠন নতুন কোনো ঘটনা নয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, মেঘ, সমুদ্র কিংবা হ্রদের পানিতেও ছোট-বড় ঘূর্ণি তৈরি হতে দেখা যায়।

এমনকি বৃহস্পতি ও শনির মতো গ্রহের বায়ুমণ্ডলেও বিশাল আকারের ঘূর্ণি রয়েছে। বিভিন্ন গ্রহের চৌম্বকীয় পরিবেশেও জটিল ঘূর্ণায়মান গঠনের অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন।

তবে সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠে এত ক্ষুদ্র মাত্রায় এই ধরনের গঠন সরাসরি ও এত স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সহজ ছিল না। নতুন পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই।

সূর্যের পৃষ্ঠে থাকা চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তার কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সময়ের সঙ্গে এই চৌম্বকীয় পরিবেশে পরিবর্তন ঘটে এবং তার সঙ্গে সূর্যের বিভিন্ন সক্রিয় ঘটনাও সম্পর্কিত।

সূর্যের চৌম্বকীয় অঞ্চলে শক্তি জমা হতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই শক্তি হঠাৎ মুক্তি পেলে তৈরি হতে পারে শক্তিশালী সৌর বিস্ফোরণ ও অন্যান্য সৌর কার্যকলাপ।

তাই সূর্যের পৃষ্ঠে এত সূক্ষ্ম ঘূর্ণি কীভাবে তৈরি হয় এবং এগুলোর সঙ্গে চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের কী সম্পর্ক রয়েছে, তা বোঝা বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকে ভাবতে পারেন, সূর্য থেকে কোটি কোটি কিলোমিটার দূরে পৃথিবীতে বসে এই ক্ষুদ্র ঘূর্ণি নিয়ে গবেষণা করার প্রয়োজন কী? আসলে এর সঙ্গে পৃথিবীর প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

সূর্যের সক্রিয়তা থেকে তৈরি হতে পারে মহাকাশের অস্থির পরিবেশ, যাকে সাধারণভাবে মহাজাগতিক বা মহাকাশ আবহাওয়া বলা হয়। শক্তিশালী সৌর কার্যকলাপ পৃথিবীর কাছাকাছি মহাকাশের পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও পড়ুন :  Gold Price Crash! কেন কমছে স্বর্ণের দাম আর সামনে কী হতে পারে?

এর প্রভাব পড়তে পারে কৃত্রিম উপগ্রহ, জিপিএস ব্যবস্থা, রেডিও যোগাযোগ এবং বিভিন্ন মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির ওপর। অত্যন্ত শক্তিশালী সৌর ঘটনার ক্ষেত্রে পৃথিবীর বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এই কারণেই সূর্যের পৃষ্ঠে ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলো বোঝা শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয় নয়। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার নিরাপত্তার জন্যও এর গুরুত্ব রয়েছে।

নতুন পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীদের সামনে সূর্যের পৃষ্ঠের আরও সূক্ষ্ম ও জটিল ছবি তুলে ধরেছে। এতদিন যে গঠনগুলো কেবল তাত্ত্বিকভাবে অনুমান করা হতো বা খুব অস্পষ্টভাবে দেখা যেত, শক্তিশালী সৌর টেলিস্কোপের সাহায্যে সেগুলোর অনেকটাই এখন বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে।

গবেষকেরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই ক্ষুদ্র ঘূর্ণির উৎপত্তি, স্থায়িত্ব এবং সূর্যের চৌম্বকীয় কার্যকলাপের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

সূর্য আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র হলেও তার ভেতরে ও পৃষ্ঠে এখনও লুকিয়ে আছে অসংখ্য রহস্য। দূর থেকে শান্ত জ্বলন্ত গোলক মনে হওয়া এই নক্ষত্রের গায়ে যে আসলে অবিরাম তোলপাড় চলছে, ক্ষুদ্র প্লাজমা ঘূর্ণির এই ছবি যেন তারই আরও একটি চমকপ্রদ প্রমাণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ