বিশ্বকাপ ফাইনালের উত্তেজনা শেষ হলেও মাঠের বাইরের বিতর্ক যেন থামছেই না। ফাইনাল ম্যাচের পর মাঠে স্পেন ও আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনায় অবশেষে শাস্তি ঘোষণা করেছে ফিফা। বড় ধরনের শাস্তির মুখে পড়েছেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস। তাঁকে ১০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি গুনতে হবে বড় অঙ্কের জরিমানাও।
শুধু পারেদেস নন, একই ঘটনায় আর্জেন্টিনার আরও কয়েকজন ফুটবলার ও কোচ শাস্তি পেয়েছেন। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন স্পেনের তারকা গাভিও। মাঠের শৃঙ্খলা ভঙ্গ, অখেলোয়াড়সুলভ আচরণ এবং বৈষম্যমূলক আচরণের মতো অভিযোগও এই শাস্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হারের পর স্পেনের খেলোয়াড়দের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন আর্জেন্টিনার কয়েকজন ফুটবলার। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একপর্যায়ে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও শারীরিক সংঘর্ষ শুরু হয়।
এই ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। ম্যাচের পর স্পেনের এরিক গার্সিয়ার সঙ্গে তাঁর তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে পারেদেস তাঁর গলা চেপে ধরেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে স্পেনের গাভির সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে গাভি মাটিতে পড়ে যান।
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে ম্যাচ কর্মকর্তারা পারেদেসকে লাল কার্ড দেখান। তবে সেখানেই বিষয়টির ইতি হয়নি। ফিফা জানিয়ে দেয়, ম্যাচের পরের এই বিশৃঙ্খলা নিয়ে আলাদা তদন্ত করা হবে।
তদন্ত শেষে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফিফা। অখেলোয়াড়সুলভ আচরণ এবং মাঠের শৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো অভিযোগে তাঁকে ১০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এটি আর্জেন্টিনার এই তারকা মিডফিল্ডারের জন্য বড় ধাক্কা। জাতীয় দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে তাঁকে ছাড়াই মাঠে নামতে হবে আর্জেন্টিনাকে।
শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, পারেদেসকে ৯০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানাও করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে, যদিও বিনিময় হার অনুযায়ী অঙ্কটি পরিবর্তিত হবে।
এই ঘটনায় আর্জেন্টিনার আরেক ফুটবলার নাহুয়েল মোলিনাও ফিফার শাস্তির মুখে পড়েছেন। তাঁকে সাতটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মোলিনার ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের জরিমানা ধার্য করা হয়েছে। তাঁকে ৯০ হাজার মার্কিন ডলার দিতে হবে। ফলে বিশ্বকাপ ফাইনালের পর মাঠের আচরণ আর্জেন্টিনার একাধিক খেলোয়াড়ের জন্য বেশ ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আর্জেন্টিনার থিয়াগো আলমাদাকেও শাস্তি দিয়েছে ফিফা। তাঁকে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ৩০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়েছে।
অন্যদিকে স্পেনের গাভিও একই ধরনের শাস্তির মুখে পড়েছেন। তাঁকে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ৩০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ফাইনালের পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় শুধু আর্জেন্টিনার ফুটবলাররাই নয়, স্পেনের একজন খেলোয়াড়ও ফিফার শাস্তির আওতায় এসেছেন।
শুধু ফুটবলারদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়নি ফিফা। আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালাকেও তিনটি ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তাঁর বিরুদ্ধেও ম্যাচের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আয়ালাকে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানাও দিতে হবে।
ফলে বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের বিতর্কে আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচিং স্টাফও বড় শাস্তির মুখে পড়েছেন।
ফিফার শাস্তির সবচেয়ে বড় আর্থিক ধাক্কা এসেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের ওপর। সংস্থাটিকে ৩ লাখ ২১ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়েছে।
বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকার কাছাকাছি। শুধু আর্থিক জরিমানাই নয়, আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে ফিফা।
এর ফলে আর্জেন্টিনাকে তাদের পরবর্তী দুটি হোম ম্যাচে অর্ধেক দর্শক নিয়ে খেলতে হবে। অর্থাৎ, নির্ধারিত দর্শক ধারণক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারবে না আর্জেন্টিনা।
ফিফার এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—মাঠের ভেতরে কিংবা গ্যালারিতে বৈষম্যমূলক আচরণকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখছে না বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
খেলোয়াড়দের শারীরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি বৈষম্যমূলক স্লোগান, অঙ্গভঙ্গি এবং ম্যাচের পরিবেশ নষ্ট করার মতো বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় এসেছে।
ফুটবলে আবেগ থাকবেই। বিশেষ করে বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে উত্তেজনা আরও বেশি থাকে। কিন্তু সেই আবেগ যদি মারামারি, অপমানজনক আচরণ কিংবা বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়, তাহলে তার শাস্তি যে কঠোর হতে পারে, এই ঘটনায় সেটিই আবার সামনে এল।
লিয়ান্দ্রো পারেদেস: ১০ ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা এবং ৯০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা।
নাহুয়েল মোলিনা: ৭ ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা এবং ৯০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা।
থিয়াগো আলমাদা: ১ ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা এবং ৩০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা।
রবার্তো আয়ালা: ৩ ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা এবং ৩০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা।
গাভি: ১ ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা এবং ৩০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা।
আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন: ৩ লাখ ২১ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা এবং পরবর্তী দুটি হোম ম্যাচে অর্ধেক দর্শক নিয়ে খেলার নির্দেশ।
বিশ্বকাপ ফাইনালের পর এমন শাস্তি নিঃসন্দেহে আর্জেন্টিনা দলের জন্য বড় ধাক্কা। বিশেষ করে পারেদেসের ১০ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা জাতীয় দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সামনে আন্তর্জাতিক সূচিতে তাঁকে ছাড়া একাধিক ম্যাচ খেলতে হবে আর্জেন্টিনাকে।
একই সঙ্গে ফেডারেশনের ওপর বড় অঙ্কের জরিমানা এবং হোম ম্যাচে দর্শকসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তও দলের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে জয়-পরাজয়ের আবেগ থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আবেগ যেন মাঠের শৃঙ্খলা নষ্ট না করে, ফিফার এই সিদ্ধান্ত সেই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট করে দিল। ফাইনালের পরের মারামারির ঘটনায় আর্জেন্টিনা ও স্পেনের কয়েকজন খেলোয়াড় শাস্তি পেলেও সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞা এসেছে আর্জেন্টিনার পারেদেসের ওপর। এখন দেখার বিষয়, এই শাস্তির প্রভাব আগামী আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে দুই দলের পারফরম্যান্সে কতটা পড়ে।


