খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeআইন ও আদালতমানবতাবিরোধী মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মোজাফফর

মানবতাবিরোধী মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মোজাফফর

প্রসিকিউশন তাদের আবেদনে উল্লেখ করে, মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত কার্যক্রমের স্বার্থে তাকে আদালতের সামনে হাজির করা প্রয়োজন। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করেন।

দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনের নাম। সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি হিসেবে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়ার পর এবার তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।

এ ঘটনাকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর পর তাকে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। পরে দুপুরের দিকে তাকে বিচারকের সামনে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেয় প্রসিকিউশন।

আদালত সূত্র জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো এবং পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। মামলার তদন্তের স্বার্থে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে গত মঙ্গলবার প্রসিকিউশনের আবেদনের পর বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মোজাফফর হোসেনকে নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। আদালত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার মধ্যে তাকে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করার আদেশ দেন।

প্রসিকিউশন তাদের আবেদনে উল্লেখ করে, মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত কার্যক্রমের স্বার্থে তাকে আদালতের সামনে হাজির করা প্রয়োজন। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করেন।

আরও পড়ুন :  নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান: ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসেই কি শুরু হয়েছিল প্রলয়?

প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় মোজাফফর হোসেনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগগুলোর প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে। এ কারণে আদালতের কাছে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো এবং প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়ে আদালতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়নি। ফলে মামলার চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণে তদন্তের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গত ২১ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারির আবেদন করে প্রসিকিউশন। যেহেতু তিনি ইতোমধ্যে অন্য একটি মামলায় আটক ছিলেন, তাই তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জন্য এই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অন্য মামলায় কারাগারে বা হেফাজতে থাকলে তাকে নতুন মামলার শুনানিতে হাজির করতে আদালত প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করতে পারেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমেই মোজাফফরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা হয়।

মোজাফফর হোসেনকে দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করে। গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে আটক করে।

পরদিন বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এরপর তাকে সেনা হেফাজতে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার পর তার গ্রেপ্তার দেশের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়।

আরও পড়ুন :  এইচএসসি ২০২৬ পরীক্ষায় সিসিটিভি ও বডি ওর্ন ক্যামেরায় নজরদারি!

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে তাকে খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা চলছিল। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে তাকে আটক করা সম্ভব হয়।

মোজাফফর হোসেনের নাম প্রথম আলোচনায় আসে সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি হিসেবে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। সেই সময় ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

ঘটনার পর সামরিক আদালতে বিচার অনুষ্ঠিত হয়। সেই বিচারে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা ঘোষণা করা হয়। মোজাফফর হোসেনও সেই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন।

দীর্ঘ সময় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হলেও সাম্প্রতিক অভিযানের মাধ্যমে তিনি আবারও আইনের আওতায় আসেন।

একই দিনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও।

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ফেনীতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। ওই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য গত ২১ জুলাই দিন ধার্য ছিল।

প্রসিকিউশন আদালতের কাছে আরও দুই মাস সময় চাইলেও আদালত নতুন তারিখ নির্ধারণ করেননি। কারণ হিসেবে মোজাফফর হোসেনের সঙ্গে তার সম্ভাব্য যোগসাজশের অভিযোগের বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।

ফলে তদন্তের স্বার্থে তাকেও আদালতে হাজির করা হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একই সময়ে একাধিক ব্যক্তিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার ঘটনা তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

আরও পড়ুন :  ভারী বৃষ্টি ও বন্যার সতর্কতা! নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, কতদিন চলবে এই দুর্যোগ?

তদন্তকারী সংস্থাগুলো এখন বিভিন্ন নথি, সাক্ষ্য এবং ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কার কী ধরনের ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।

প্রয়োজনে আরও ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।

ট্রাইব্যুনালে হাজির করার পর আদালত প্রসিকিউশনের আবেদন শুনবেন। এরপর আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন মোজাফফর হোসেনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হবে কি না।

একই সঙ্গে তদন্তকারী সংস্থাকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়েও আদালত আদেশ দিতে পারেন।

পরবর্তী সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা হলে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মোজাফফর হোসেনকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন মহল থেকে মামলার দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু বছর আগের আলোচিত ঘটনাগুলোর সঙ্গে বর্তমান তদন্তের যোগসূত্র বের করা সহজ নয়। এজন্য প্রত্যেকটি তথ্য, নথি এবং সাক্ষ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

আইনজীবীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কোনো ব্যক্তিকে হাজির করা মানেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি নয়। এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র।

তদন্ত শেষ হওয়ার পর আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং আইনি যুক্তির ভিত্তিতেই মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। তাই চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিষয়ে আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ