ফুটবল বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা আবারও মুখোমুখি। বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালে এই দুই পরাশক্তির লড়াইকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। একদিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে থমাস টুখেলের অধীনে নতুন রূপে উজ্জীবিত ইংল্যান্ড। ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে কোনো দলই এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে প্রস্তুত নয়।
স্পেন ইতোমধ্যেই ফাইনালে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে। ফলে এই ম্যাচের বিজয়ী দল আগামী রবিবার শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে স্পেনের মুখোমুখি হবে।
সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছেন। মরগান রজার্স, রিস জেমস এবং জেড স্পেন্সকে শুরুর একাদশে সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ইংল্যান্ডের সম্ভাব্য ছকটি হলো ৪-২-৩-১। গোলপোস্টে থাকছেন জর্ডান পিকফোর্ড। রক্ষণভাগে রিস জেমস, জন স্টোনস, মার্ক গেহি এবং জেড স্পেন্স। মাঝমাঠে ডেকলান রাইস ও এলিয়ট অ্যান্ডারসনের সঙ্গে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় থাকবেন জুড বেলিংহাম। দুই প্রান্তে মরগান রজার্স ও অ্যান্থনি গর্ডন এবং স্ট্রাইকার হিসেবে হ্যারি কেন নেতৃত্ব দেবেন।
বিশেষ করে মরগান রজার্সকে শুরুর একাদশে রাখার সিদ্ধান্তকে ট্যাকটিক্যাল মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের আধিপত্যকে ভাঙতেই টুখেলের এই পরিকল্পনা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি শেষ দুটি ম্যাচের একই একাদশ ধরে রেখেছেন। আক্রমণভাগে লিওনেল মেসি ও জুলিয়ান আলভারেজের জুটির ওপরই বড় ভরসা আলবিসেলেস্তেদের।
মাঝমাঠে রয়েছেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ এবং জুলিয়ানো সিমেওনে। রক্ষণভাগে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ও নাহুয়েল মোলিনার অভিজ্ঞতা দলকে বাড়তি শক্তি দেবে।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ায় আর্জেন্টিনাকে ঘিরে প্রত্যাশাও অনেক বেশি। চার বছর আগে ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপ জয়ী দলের নয়জন খেলোয়াড় এবারও স্কালোনির পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
লিওনেল মেসির জন্য এই ম্যাচটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এটিই হতে পারে তাঁর প্রথম এবং সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। বিশ্বকাপে আট গোল করে তিনি এখনও সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন।
কিলিয়ান এমবাপ্পে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ায় গোল্ডেন বুটের লড়াই এখন মূলত মেসি, হ্যারি কেন এবং জুড বেলিংহামের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। কেন ও বেলিংহাম দুজনেরই গোলসংখ্যা ছয়।
মেসিকে আটকাতে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগকে হতে হবে নিখুঁত। বিশেষ করে ডেকলান রাইস ও জন স্টোনসের ওপর থাকবে বড় দায়িত্ব।
ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার ডেকলান রাইস বলেন, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে খেলার চেয়ে বড় উপলক্ষ আর হতে পারে না।
তিনি জানান, আর্জেন্টিনার খেলার ধরন নিয়ে তারা পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ করেছেন এবং নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামবেন। পুরো ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখাই হবে তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে রয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় অধ্যায়। তবে থমাস টুখেল অতীতের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে গুরুত্ব দিতে রাজি নন।
টুখেল বলেন, এটি দুটি বড় ফুটবল জাতির মধ্যকার একটি বড় ম্যাচ। তবে তাদের মূল লক্ষ্য শুধু একটি—ফাইনালে ওঠা। তিনি আরও জানান, সেমিফাইনালে খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্ষুধা, আত্মবিশ্বাস ও জয়ের মানসিকতা দেখে তিনি সন্তুষ্ট।
তার মতে, আর্জেন্টিনার সেরা সংস্করণের মুখোমুখি হওয়ার জন্যই প্রস্তুতি নিয়েছে ইংল্যান্ড। একই সঙ্গে তিনি নিজের দল থেকেও সেরাটা প্রত্যাশা করছেন।
সাবেক ইংলিশ তারকা ডেভিড বেন্টলি ইংল্যান্ডের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তাঁর মতে, বর্তমান ইংল্যান্ড দলের খেলোয়াড়রা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারবেন।
বেন্টলি মনে করেন, মেসিকে কেন্দ্র করেই আর্জেন্টিনার খেলার কৌশল আবর্তিত হয়। ফলে ইংল্যান্ডকে রক্ষণভাগে শক্ত থাকতে হবে এবং দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে হবে।
তিনি ম্যাচের সম্ভাব্য ফলাফল হিসেবে ২-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডের জয়ের ভবিষ্যদ্বাণীও করেছেন।
হ্যারি কেন ও জুড বেলিংহাম দুজনের সামনেই রয়েছে নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ। সেমিফাইনালে গোল করতে পারলে তারা ইংল্যান্ডের হয়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতার নতুন রেকর্ড গড়বেন।
হ্যারি কেন ২০১৮ বিশ্বকাপে ছয় গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। অন্যদিকে জুড বেলিংহাম মাত্র দুটি বিশ্বকাপ খেলেই সাতটি গোল করে ইংল্যান্ডের অন্যতম সফল বিশ্বকাপ গোলদাতায় পরিণত হয়েছেন।
ইংল্যান্ড: জর্ডান পিকফোর্ড; রিস জেমস, জন স্টোনস, মার্ক গেহি, জেড স্পেন্স; ডেকলান রাইস, এলিয়ট অ্যান্ডারসন; মরগান রজার্স, জুড বেলিংহাম, অ্যান্থনি গর্ডন; হ্যারি কেন।
আর্জেন্টিনা: এমিলিয়ানো মার্টিনেজ; নাহুয়েল মোলিনা, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো; লিয়ান্দ্রো পারেদেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, জুলিয়ানো সিমেওনে, এনজো ফার্নান্দেজ; লিওনেল মেসি ও জুলিয়ান আলভারেজ।
কাগজে-কলমে দুই দলই সমান শক্তিশালী। আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা ও মেসির জাদুর বিপরীতে রয়েছে ইংল্যান্ডের তারুণ্য, গতি ও টুখেলের কৌশলী পরিকল্পনা। মাঝমাঠের লড়াই এবং মেসিকে কতটা কার্যকরভাবে আটকে রাখা যায়, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে ম্যাচের ফলাফল।
একটি বিষয় নিশ্চিত—বিশ্ব ফুটবল আরেকটি স্মরণীয় রাতের অপেক্ষায়। ফাইনালের মঞ্চে স্পেনের প্রতিপক্ষ কে হবে, তার উত্তর মিলবে এই মহারণেই।

