খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদওয়েস্ট বেঙ্গলসিকিমে সুড়ঙ্গ ধসের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: প্রাণ হারালেন বাংলার ১১ শ্রমিক, বহুজন এখনও...

সিকিমে সুড়ঙ্গ ধসের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: প্রাণ হারালেন বাংলার ১১ শ্রমিক, বহুজন এখনও আটকে

মেটেলি ব্লকের অন্তত ছয়জন শ্রমিক এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কিলকোট চা-বাগানের ১১ নম্বর লাইন শ্রমিক মহল্লার গ্রাবিয়েল টিজ্ঞা, শিবা মুডা এবং বিকেশ্বর ওঁরাও রয়েছেন। এছাড়া ইনডং চা-বাগানের শ্যাম ওঁরাও এবং নাগেশ্বরী চা-বাগানের অমিতলাল গোরের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে।

সিকিমের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে ভয়াবহ ধসের ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত বাংলার ১১ জন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। মৃতদের অধিকাংশই মালবাজার, মেটেলি, নাগরাকাটা এবং বানারহাট এলাকার বাসিন্দা। জীবিকার সন্ধানে তাঁরা সিকিমে নির্মাণকাজে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু কর্মস্থলেই তাঁদের জীবন শেষ হয়ে গেল। এদিকে এখনও বহু শ্রমিক সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের উদ্ধারে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকারী দল।

সোমবার দুপুরে সিকিমের নামচি সংলগ্ন মামরিং এলাকায় নির্মীয়মাণ একটি সুড়ঙ্গে হঠাৎ ধস নামে। ধসের সময় বহু শ্রমিক সুড়ঙ্গের ভেতরে কাজ করছিলেন। আচমকা বিপুল পরিমাণ মাটি ও পাথর ধসে পড়ায় শ্রমিকদের একাংশ বেরিয়ে আসতে পারলেও অনেকে ভেতরেই আটকে পড়েন।

দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। রাতভর এবং পরদিনও অভিযান অব্যাহত থাকে। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে থাকা শ্রমিকদের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, মৃত ১১ জনের প্রত্যেকেই পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে ৯ জন মালবাজার মহকুমার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। জীবিকার প্রয়োজনে তাঁরা কয়েক মাস আগে সিকিমে গিয়ে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন।

আরও পড়ুন :  নরম খোলসের কাঁকড়া চাষে নতুন সম্ভাবনা: রফতানি, লাভ ও কর্মসংস্থানে এগোচ্ছে বাংলাদেশ

মৃত্যুর খবর পৌঁছাতেই তাঁদের পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে গোটা এলাকা।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, নিহতদের অনেকেই আগে ডুয়ার্স অঞ্চলের বিভিন্ন চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চা-বাগানের আর্থিক সংকট, অনিয়মিত মজুরি এবং কর্মসংস্থানের অভাবে তাঁরা বিকল্প জীবিকার সন্ধান করতে বাধ্য হন।

পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অনেকেই সিকিমে নির্মাণ প্রকল্পে কাজ নিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই কর্মস্থলই তাঁদের জীবনের শেষ গন্তব্য হয়ে দাঁড়াল।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জলপাইগুড়ির মেটেলি ও নাগরাকাটা ব্লক।

মেটেলি ব্লকের অন্তত ছয়জন শ্রমিক এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কিলকোট চা-বাগানের ১১ নম্বর লাইন শ্রমিক মহল্লার গ্রাবিয়েল টিজ্ঞা, শিবা মুডা এবং বিকেশ্বর ওঁরাও রয়েছেন। এছাড়া ইনডং চা-বাগানের শ্যাম ওঁরাও এবং নাগেশ্বরী চা-বাগানের অমিতলাল গোরের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে।

অন্যদিকে নাগরাকাটা ব্লকের গ্রাসমোর চা-বাগানের আনন্দ টোপ্পো, সুখানি বস্তির অর্জুন সাওতাল এবং শুলকাপাড়ার বালো ওঁরাওয়ের মৃত্যুর খবরও সামনে এসেছে।

এছাড়াও বানারহাট ব্লকের বিন্নাগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার তেলিপাড়া চা-বাগানের বাসিন্দা আদেশ ওঁরাওয়ের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন :  মহাশূন্যে ফুটবল খেলার স্বপ্ন! আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে ‘ট্রাইওন্ডা’ বল নিয়ে নতুন গবেষণায় নভোশ্চররা

দুর্ঘটনার পর এখনও কয়েকজন শ্রমিকের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাঁরা সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তাঁদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উদ্ধার অভিযান সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সঠিকভাবে নিখোঁজের সংখ্যা বলা সম্ভব নয়। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

দুর্ঘটনার সময় সিকিমজুড়ে প্রবল বৃষ্টিপাত চলছিল। আবহাওয়া দপ্তর ইতোমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় লাল সতর্কতা জারি করেছিল। টানা বৃষ্টি এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

তা সত্ত্বেও প্রশাসন, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা নিরবচ্ছিন্নভাবে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের মূল লক্ষ্য যত দ্রুত সম্ভব আটকে থাকা শ্রমিকদের নিরাপদে বের করে আনা।

যে সুড়ঙ্গে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটি প্রায় ২৫০ মিটার দীর্ঘ একটি ডাবল-লেন টানেল। এটি সিকিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পূর্ব সিকিমের পকিয়ং জেলার নামচি ও রংপো সংলগ্ন মামরিং এলাকায় নির্মাণাধীন এই সুড়ঙ্গটি ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের তিস্তা স্টেজ-৪ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছাকাছি অবস্থিত।

প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে গ্যাংটকের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। পাশাপাশি নাথু-লা পাসের দিকে সেনাবাহিনীর যান চলাচলও দ্রুত ও নিরাপদ হবে। পর্যটন ও কৌশলগত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এই সুড়ঙ্গের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

আরও পড়ুন :  ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: শাকিরার ‘ওয়াকা ওয়াকা’ ম্যাজিকের প্রত্যাবর্তন, নোরা ফতেহির নতুন গান ঘিরে তুঙ্গে উন্মাদনা

দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের জন্য আধিকারিকদের সিকিমে পাঠানো হয়েছে।

নিহতদের পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং উদ্ধার অভিযানের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

এই দুর্ঘটনায় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় গভীর শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। যাঁরা পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন, তাঁদের আকস্মিক মৃত্যুতে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারাও নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

সিকিমের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে এই ভয়াবহ ধস আবারও নির্মাণ প্রকল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। উন্নয়নমূলক কাজ যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার চেয়েও বেশি জরুরি। উদ্ধার অভিযান এখনও চলছে এবং আটকে থাকা শ্রমিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিহত শ্রমিকদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।