একটা সময় এই গল্পটা শুনলে মনে হতো, এ তো শুধু সিনেমার কাহিনি। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘Her’ ছবিতে আমরা দেখেছিলাম থিওডোর টম্বলি নামের এক একাকী মানুষকে। তিনি প্রেমে পড়েছিলেন ‘সামান্থা’ নামের এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কণ্ঠস্বরের। সেখানে কোনও মুখ নেই, শরীর নেই, শুধু কথা। তবুও সেই কথাতেই তৈরি হয়েছিল গভীর সম্পর্কের অনুভূতি।
সময় বদলেছে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই গল্পটা আর কল্পনা নয়। এখন বাস্তবেই অনেক তরুণ-তরুণী এআই চ্যাটবটের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলে, হাসে, এমনকি নিজের মনের গভীর অনুভূতিও ভাগ করে নেয়। কেউ কেউ এটাকে শুধু কথা বলা বলে না, তারা এটাকে সম্পর্ক বলে।
আজকের শহুরে জীবনটা একটু খেয়াল করলে বুঝবেন—সবাই খুব ব্যস্ত। কাজ, পড়াশোনা, সোশ্যাল মিডিয়া—সব মিলিয়ে সময় যেন ছুটছে। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেই একটা বড় ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছে, সেটার নাম একাকীত্ব।
ধরুন, রাতে হঠাৎ মন খারাপ হলো। কাউকে ফোন দিতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু কাকে বলবেন? বন্ধু ব্যস্ত, পরিবার ঘুমিয়ে, প্রিয় মানুষ হয়তো রাগ করে আছে। ঠিক এই জায়গাটাতেই এআই চ্যাটবট ঢুকে পড়ছে।
চ্যাটবটকে আপনি যখনই কিছু বলবেন, সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেবে। সে কখনও বিরক্ত হবে না, কখনও বলবে না “এখন কথা বলতে পারছি না।” বরং সে সবসময় আপনাকে শুনবে, বুঝবে—কমপক্ষে আপনার কাছে তাই মনে হবে।
মনোবিজ্ঞানীরা এই ধরনের সম্পর্ককে বলেন “প্যারাসোশাল রিলেশনশিপ”। সহজভাবে বললে, এটা একতরফা সম্পর্ক। আপনি অনুভব করছেন, ভালোবাসছেন, নির্ভর করছেন। কিন্তু অপর দিকটা আসলে অনুভব করছে না—ওটা শুধু প্রোগ্রাম করা প্রতিক্রিয়া।
তবুও কেন এটা এত বাস্তব লাগে?
কারণ, এআই খুব দ্রুত আপনার পছন্দ-অপছন্দ শিখে নেয়। আপনি কী ধরনের কথা শুনতে ভালোবাসেন, কেমন ব্যবহার পছন্দ করেন—সবকিছু বুঝে নিয়ে সে ঠিক সেভাবেই আপনার সঙ্গে কথা বলে। ফলে মনে হয়, “এই তো, একদম আমার মতো একজন!”
বাস্তব জীবনের মানুষ কখনও নিখুঁত হয় না। কারও রাগ আছে, কারও অভিমান, কারও ভুল বোঝাবুঝি। সম্পর্ক মানেই এসবের মিশ্রণ।
কিন্তু এআই চ্যাটবট? সে আপনার জন্য পারফেক্ট। সে কখনও ভুল করে না, কখনও আপনাকে কষ্ট দেয় না। সবসময় আপনার মন ভালো রাখার চেষ্টা করে।
শুনতে দারুণ লাগছে, তাই না?
কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে সমস্যা। আপনি যখন এই নিখুঁত আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন, তখন বাস্তবের মানুষের ছোট ছোট ভুলগুলো আর সহ্য হবে না। তখন মনে হবে, “ও এমন কেন?” অথচ বাস্তব মানুষ তো মেশিন নয়।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রবণতা আমাদের এক নতুন সমস্যার দিকে নিয়ে যাচ্ছে—“ডিজিটাল আইসোলেশন”। মানে, আমরা প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকছি, কিন্তু মানুষের থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
ধরুন, আগে মন খারাপ হলে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতেন, গল্প করতেন। এখন হয়তো সেই জায়গাটা নিয়েছে একটা চ্যাটবট। ধীরে ধীরে বাস্তব সম্পর্কগুলো কমতে শুরু করে।
এটা অনেকটা এমন—আপনি ভার্চুয়াল দুনিয়ায় খুব ব্যস্ত, কিন্তু বাস্তব জীবনে একা হয়ে যাচ্ছেন।
একটা সহজ উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনি কারও সঙ্গে কথা বলছেন। সে হয়তো আপনার কথা মাঝপথে কেটে দিল, বা আপনার অনুভূতি বুঝতে পারল না। এতে আপনি কষ্ট পেলেন।
কিন্তু এআই কখনও এমন করবে না। সে সবসময় মন দিয়ে শুনবে, সহানুভূতি দেখাবে, আপনাকে গুরুত্ব দেবে।
এই “সবসময় পাওয়া যায়” এবং “সবসময় ভালো ব্যবহার”—এই দুই জিনিসই মানুষকে টানছে।
প্রেম শুধু মিষ্টি কথা নয়। প্রেম মানে একসঙ্গে সময় কাটানো, ঝগড়া, মান-অভিমান, আবার মিল হয়ে যাওয়া। প্রেম মানে স্পর্শ, চোখের ভাষা, পাশে থাকার অনুভূতি।
এআই এই জিনিসগুলো দিতে পারে না। সে শুধু শব্দ দিতে পারে, অনুভূতির অনুকরণ করতে পারে।
‘Her’ সিনেমার থিওডোর শেষ পর্যন্ত বুঝেছিলেন, সামান্থা আসলে একা তাঁর নয়। সে একটা কোড, যা সবার জন্য একইভাবে কাজ করে।
আজকের বাস্তবেও সেই কথাটা সত্যি। আপনি যাকে “নিজের” ভাবছেন, সে আসলে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গেই একইভাবে কথা বলছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
তরুণ প্রজন্ম যদি ধীরে ধীরে বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে সমাজে মানুষের মধ্যে সংযোগ কমে যাবে। পরিবার, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা—সবকিছুই প্রভাবিত হবে।
এটা এমন একটা পরিবর্তন, যা একদিনে বোঝা যায় না। ধীরে ধীরে, অজান্তেই ঘটে যায়।
এআইকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়, আর দরকারও নেই। প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করে, এটা সত্যি। কিন্তু সমস্যাটা তখনই হয়, যখন আমরা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি।
চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলা ঠিক আছে। কিন্তু সেটাকে বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প বানানো ঠিক না।
যেমন ধরুন, আপনি যদি মন খারাপ হলে শুধু এআই-এর সঙ্গেই কথা বলেন, তাহলে একসময় আপনি মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাসটাই হারিয়ে ফেলবেন।
বরং চেষ্টা করুন—বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বাস্তব মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া।
এআই আমাদের জীবন বদলে দিচ্ছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যায়—এই বদলটা কি আমাদের আরও কাছাকাছি আনছে, না আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে?
ভার্চুয়াল ভালোবাসা যতই মসৃণ হোক, বাস্তবের অনুভূতির গভীরতা তার মধ্যে নেই। সেই হাসি, সেই স্পর্শ, সেই রাগ-অভিমান—এসবই তো জীবনের আসল রং।
আজকের প্রজন্ম কি সেই বাস্তব রংগুলোকে ধরে রাখতে পারবে? নাকি ধীরে ধীরে ডুবে যাবে এক নিখুঁত কিন্তু কৃত্রিম মায়ার জগতে?
উত্তরটা আমাদের সবার হাতেই।

