বাংলাদেশের রপ্তানি খাত আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় নতুন করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের উদ্যোগ দেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি শিল্পের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক, জুলাই ২০২৬’ প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু বাংলাদেশের রপ্তানিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং পুরো এশীয় অঞ্চলের বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে যেখানে প্রতিটি দেশের জন্য উৎপাদন ব্যয় ও শুল্কহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেখানে অতিরিক্ত শুল্ক বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এডিবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত নতুন শুল্ক কার্যকর হলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কার্যকর শুল্কহার গড়ে ১.২ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এই অতিরিক্ত ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং অন্যান্য রপ্তানিযোগ্য পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্পের বড় অবদান থাকায় এই খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। শুল্ক বৃদ্ধি পেলে আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানি আদেশ কমিয়ে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে।
ইউএসটিআরের মূল্যায়নে বাংলাদেশসহ ৫৪টি দেশকে এমন তালিকায় রাখা হয়েছে, যেখানে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এটি এখনও প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় বাংলাদেশ, ভারত, চীন, জাপান, ভিয়েতনামসহ প্রায় ৬০টি দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এই পর্যালোচনার উদ্দেশ্য হলো, কোনো দেশের নীতি বা কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর কিনা তা নির্ধারণ করা। পর্যালোচনায় নেতিবাচক ফল এলে সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে, আর যুক্তরাষ্ট্র এই খাতের অন্যতম বৃহৎ বাজার। ফলে অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে কয়েকটি বড় ধরনের প্রভাব দেখা দিতে পারে।
প্রথমত, বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে যাবে, যার ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় ক্রেতারা বিকল্প উৎস খুঁজতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, নতুন রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন কমে গেলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
এডিবি জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও ইউএসটিআরের সাম্প্রতিক তদন্ত সেই পরিস্থিতিকে আবার অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, নতুন শুল্কের পরিধি, কার্যকর হওয়ার সময় এবং কোন কোন পণ্যের ওপর এটি প্রযোজ্য হবে এসব বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করতে গিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ঝুঁকি হিসেবে না দেখে এটি সংস্কারের সুযোগ হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত।
শ্রম আইন বাস্তবায়ন আরও শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক শ্রমমান নিশ্চিত করা, কারখানাগুলোতে কমপ্লায়েন্স উন্নত করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, যাতে সম্ভাব্য শুল্কের নেতিবাচক প্রভাব কমানো যায়।
একই সঙ্গে নতুন বাজার অনুসন্ধান, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এডিবির মতে, এই ধরনের বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক কার্যকর হলে পুরো এশীয় অঞ্চলের সরবরাহ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন শুল্কনীতি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

