অবিরাম ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের পার্বত্য অঞ্চলজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতি। বিশেষ করে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে কয়েকশ পর্যটক আটকা পড়েছেন। সড়কে পানি উঠে যাওয়ায় এবং বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের কারণে স্বাভাবিক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
টানা বৃষ্টির কারণে সাজেকের সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় পাঁচশ পর্যটক কয়েকদিন ধরে সেখানে অবস্থান করছেন। নিরাপদে তাদের ফিরিয়ে আনতে বিকল্প রুট ব্যবহার করা হচ্ছে।
উদ্ধার পরিকল্পনা অনুযায়ী, পর্যটকদের প্রথমে গাড়িতে করে মাচালং বাজার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর নৌকায় নদী পার হয়ে আবার গাড়িতে যাত্রা করতে হবে। একইভাবে বাঘাইহাট, গবাখালি ও দিঘিনালা এলাকায়ও কয়েক দফায় নৌকা ও যানবাহনের সমন্বয়ে তাদের খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে। অর্থাৎ পুরো যাত্রাপথে সড়ক ও নৌপথ মিলিয়ে বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পর্যায়ক্রমে পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে প্রায় একশ জন পর্যটককে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ধাপে ধাপে বাকি পর্যটকদেরও নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হবে। উদ্ধার অভিযানে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবকেরাও সহযোগিতা করছেন।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সাজেকে অবস্থানরত পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা গত তিন দিন ধরে কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। যদিও বেশিরভাগ রিসোর্টে খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে, তবুও দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকায় অনেকেই উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় রিসোর্ট মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ বজায় রাখতে স্থানীয়ভাবে সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারী বর্ষণের কারণে রাঙামাটি জেলায় অন্তত ৩৭টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে। পাহাড়ি ঢল এবং অব্যাহত বৃষ্টির ফলে নতুন করে ধসের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।
পাহাড়ধসের কারণে রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সড়কে পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ায় যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে রাস্তা পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অব্যাহত বৃষ্টির কারণে বড় ধরনের ধসের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয়দের মতে, আবহাওয়া অনুকূলে না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য তিন জেলায় গত তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো নতুন করে পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসতি গড়ে ওঠা এবং অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
পাহাড়ধসে প্রাণহানির পর প্রশাসনের প্রস্তুতি ও কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, দুর্যোগ শুরুর আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক বৈঠক, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান, মাইকিং এবং আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখাসহ একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। তবে অনেক বাসিন্দা বিভিন্ন কারণে নিরাপদ স্থানে যেতে অনীহা প্রকাশ করায় ঝুঁকি পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয়নি।
অব্যাহত ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কক্সবাজারের সঙ্গে রেল যোগাযোগ এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ফলে যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে এবং পর্যটন খাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পানি নেমে গেলে দ্রুত লাইনের অবস্থা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে ট্রেন চলাচল পুনরায় চালু করা হবে।
আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন। একই সঙ্গে পাহাড়ের পাদদেশ, ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল এবং পাহাড়ি ছড়ার আশপাশে বসবাসকারী মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো জানায়, আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে আরও আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।

