ফুটবল বিশ্বকাপ যত শেষের দিকে এগোয়, প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব ততই বেড়ে যায়। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে শুরু করে প্রতিটি সিদ্ধান্তই একটি দলের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। তাই খেলোয়াড়দের পাশাপাশি রেফারিদের ভূমিকা নিয়েও বাড়ে নজর। একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেমন ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারে, তেমনি সৃষ্টি করতে পারে দীর্ঘ বিতর্ক। সেই কারণেই বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা রেফারি নিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে।
চলতি বিশ্বকাপেও একাধিক ম্যাচে রেফারিং নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে শেষ ষোলোর একটি ম্যাচের পর রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি ফিফার তদন্ত পর্যন্ত গড়ায়। এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের রেফারিরা একে অপরের দেশের ম্যাচ পরিচালনা করতে পারেন না। শুধু তাই নয়, টুর্নামেন্টের নির্দিষ্ট অংশেও তাঁদের দায়িত্ব সীমিত রাখা হয়।
ফিফার এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। মাঠের বাইরে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাস যাতে মাঠের ভেতরের সিদ্ধান্তে কোনওভাবেই প্রভাব না ফেলে, সেটাই নিশ্চিত করতে চায় সংস্থাটি।
বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে সামান্য পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও বড় বিতর্কে রূপ নিতে পারে। তাই রেফারি নির্বাচন করার সময় শুধু তাঁর দক্ষতা নয়, সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক সম্পর্কও বিবেচনা করা হয়।
এই নীতির মূল কারণ ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ। সে সময় দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ শুরু হয়।
প্রায় ৭৪ দিন ধরে চলা সেই যুদ্ধে শত শত সেনা প্রাণ হারান। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা আত্মসমর্পণ করলে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তবে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর সেই সংঘাতের ছাপ আজও পুরোপুরি মুছে যায়নি।
এই ঐতিহাসিক বিরোধের কারণেই আন্তর্জাতিক ফুটবলেও দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবসময় আলাদা গুরুত্ব পায়। আর সেই বাস্তবতাকেই গুরুত্ব দিয়ে ফিফা রেফারি নিয়োগে নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে।
ফুটবল মাঠে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই বহুবার বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল।
সেই ম্যাচে দিয়েগো মারাদোনা করেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোলগুলোর একটি, যা পরে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিতি পায়। হাত দিয়ে বল জালে পাঠালেও রেফারির চোখ এড়িয়ে যায় ঘটনাটি এবং গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়।
একই ম্যাচে মারাদোনা করেন আরেকটি অবিশ্বাস্য একক নৈপুণ্যের গোল, যা আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয়। তবুও আর্জেন্টিনার অনেক সমর্থকের কাছে ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটির আলাদা আবেগ রয়েছে, কারণ সেটি ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
এই ঐতিহাসিক ম্যাচ দুই দেশের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করে তোলে।
বিশ্বকাপে এখন রেফারি নির্বাচন শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হয় না। ফিফা এমন কর্মকর্তাদেরই দায়িত্ব দেয়, যাঁদের দেশের সঙ্গে মাঠে নামা দুই দলের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা ঐতিহাসিক কোনও বিরোধ নেই।
এর ফলে ম্যাচ পরিচালনার সময় নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। একই সঙ্গে রেফারির ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপও কম থাকে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যদি ইংল্যান্ড এগিয়ে যায়, তাহলে আর্জেন্টিনার কোনও রেফারিকে সেই ম্যাচের দায়িত্ব দেওয়া হয় না। একইভাবে আর্জেন্টিনা যদি সেমিফাইনাল বা ফাইনালে ওঠে, তাহলে ইংল্যান্ডের কোনও রেফারিও সেই ম্যাচ পরিচালনা করতে পারেন না।
এমনকি টুর্নামেন্টের যে অংশে দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেই অংশের অন্য ম্যাচেও দুই দেশের রেফারিদের সাধারণত রাখা হয় না।
ফিফার লক্ষ্য একটাই—কোনও পক্ষ যেন মনে না করে যে ম্যাচ পরিচালনায় সামান্যতম পক্ষপাতিত্ব হয়েছে।
যেসব ম্যাচে আর্জেন্টিনা বা ইংল্যান্ড অংশ নেয় না, সেসব ম্যাচে তাঁদের দেশের রেফারিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টুর্নামেন্টের অন্য প্রান্তে থাকা ফ্রান্স, স্পেন, মরক্কো কিংবা বেলজিয়ামের ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব তাঁদের ওপর দেওয়া হতে পারে।
একইভাবে অন্য দেশের রেফারিদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়। অর্থাৎ, সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়।
আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও রেফারির গুরুত্ব একটুও কমেনি। বরং VAR চালু হওয়ার পর প্রতিটি সিদ্ধান্ত আরও বেশি বিশ্লেষণের মুখে পড়ে।
তাই বিশ্বকাপের মতো আসরে ফিফা চায় এমন পরিবেশ তৈরি করতে, যেখানে ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, রেফারির সিদ্ধান্ত নয়।
বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, এটি বিশ্বের নানা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আবেগের মিলনমেলা। তাই মাঠের বাইরের রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক বিরোধ যেন খেলার ফলাফলে কোনও প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে ফিফা দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর নীতি অনুসরণ করছে।
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের রেফারিদের একে অপরের ম্যাচ পরিচালনা থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্তও সেই নীতিরই অংশ। এর মাধ্যমে ফিফা স্পষ্ট বার্তা দিতে চায়—বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা।

