বিজ্ঞান যেন প্রতিদিন নতুন করে মানুষকে চমকে দিচ্ছে। এক সময় যে প্রাণীদের চিরতরে হারিয়ে গেছে বলে মনে করা হত, এখন তাদের ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন বিজ্ঞানীরা। সেই স্বপ্ন বাস্তবের আরও কাছাকাছি পৌঁছে গেল একটি অবাক করা সাফল্যে। গবেষণাগারে তৈরি কৃত্রিম ডিম ফুটে একসঙ্গে জন্ম নিল ২৪টি মুরগির ছানা। আর এই ঘটনাকেই ভবিষ্যতের বড় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু মুরগির উৎপাদন বাড়ানো নয়। বরং লক্ষ্য আরও বড়। প্রায় ৫০০ বছর আগে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া বিশাল আকৃতির জায়ান্ট মোয়া পাখিকে আবার ফিরিয়ে আনা।
কৃত্রিম ডিম থেকে জন্ম নিল ২৪টি ছানা
সম্প্রতি মার্কিন বায়োটেক সংস্থা Colossal Biosciences একটি বিশেষ কৃত্রিম ডিম তৈরি করে আলোচনায় এসেছে। এই ডিম কোনও মুরগি পাড়েনি। সম্পূর্ণ গবেষণাগারে তৈরি করা হয়েছে সেটি।
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হল, সেই একটি ডিম ফুটেই বেরিয়ে এসেছে ২৪টি জীবন্ত মুরগির ছানা। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি শুধু একটি পরীক্ষামূলক সাফল্য নয়, বরং বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার প্রযুক্তিতে বড় অগ্রগতি।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা?
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মূলত প্রাচীন ডিএনএ ব্যবহার করে বিলুপ্ত প্রাণীদের ফিরিয়ে আনার পথ খুঁজছেন। সহজভাবে বললে, বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর ডিএনএ সংগ্রহ করে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আবার সেই প্রাণীর বৈশিষ্ট্য তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
এই কৃত্রিম ডিমের সফলতা দেখিয়েছে যে ভবিষ্যতে বিশেষ জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন প্রাণী জন্ম দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
কে এই জায়ান্ট মোয়া?
এক সময় নিউজিল্যান্ড-এর জঙ্গলে বিশাল আকৃতির জায়ান্ট মোয়া ঘুরে বেড়াত। এরা ছিল উড়তে না পারা পাখি। উচ্চতায় অনেক সময় মানুষের থেকেও বড় হত।
ইতিহাস বলছে, অতিরিক্ত শিকারের কারণেই প্রায় ৫০০ বছর আগে এই পাখি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়। এরপর আর কখনও তাদের দেখা যায়নি।
বিজ্ঞানীরা এখন সেই হারিয়ে যাওয়া পাখিকেই ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
শুধু মোয়া নয়, ফিরতে পারে ডোডোও
Colossal Biosciences শুধু জায়ান্ট মোয়া নিয়েই কাজ করছে না। তারা আরও কয়েকটি বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার প্রকল্প নিয়েও কাজ করছে।
তার মধ্যে অন্যতম হল ডোডো। এক সময় ভারত মহাসাগরের দ্বীপে দেখা মিলত এই অদ্ভুত দেখতে পাখির। মানুষের শিকার ও পরিবেশ বদলের কারণে ডোডোও পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়।
এ ছাড়া সংস্থাটি তুষার যুগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডায়ার উলফ নিয়েও গবেষণা চালাচ্ছে। গত বছর তাদের কিছু পরীক্ষামূলক সাফল্য বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছিল।
কীভাবে ফিরিয়ে আনা হয় বিলুপ্ত প্রাণী?
এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় “ডি-এক্সটিঙ্কশন” বা বিলুপ্ত প্রাণী পুনর্জীবন প্রযুক্তি।
বিজ্ঞানীরা সাধারণত পুরনো হাড়, জীবাশ্ম বা সংরক্ষিত টিস্যু থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করেন। এরপর সেই জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে আধুনিক প্রাণীর ডিএনএ-তে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোনও বিলুপ্ত পাখির কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যের আধুনিক পাখি পাওয়া যায়, তাহলে তার জিন সম্পাদনা করে হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর মতো বৈশিষ্ট্য তৈরি করার চেষ্টা করা হয়।
এই গবেষণার ক্ষেত্রেই কৃত্রিম ডিম একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে কাজ করছে।
বিজ্ঞান নাকি ঝুঁকি? বিতর্কও কম নয়
যদিও এই প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা রয়েছে, তবুও অনেক বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদ উদ্বেগও প্রকাশ করছেন।
তাদের মতে, বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার আগে বর্তমান পৃথিবীর পরিবেশ সেই প্রাণীর জন্য উপযুক্ত কি না, তা ভাবা জরুরি। কারণ শত শত বছর আগে যে পরিবেশ ছিল, আজ পৃথিবী অনেকটাই বদলে গেছে।
আবার অনেকে মনে করেন, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বিপন্ন প্রাণী রক্ষা করতেও কাজে লাগতে পারে।
ভবিষ্যতের পৃথিবীতে কি সত্যিই ফিরবে বিলুপ্ত প্রাণী?
এক সময় ডাইনোসর ফিরিয়ে আনার গল্প শুধু সিনেমাতেই দেখা যেত। কিন্তু এখন বাস্তব বিজ্ঞানও ধীরে ধীরে সেই দিকেই এগোচ্ছে।
যদিও জায়ান্ট মোয়া বা ডোডোকে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে এখনও অনেক সময় লাগতে পারে, তবুও কৃত্রিম ডিম থেকে ২৪টি ছানার জন্ম বিজ্ঞানীদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়েছে।
বিজ্ঞান যদি এভাবেই এগোতে থাকে, তাহলে হয়তো আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই মানুষ আবার দেখতে পাবে ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া কিছু প্রাণীকে।
কৃত্রিম ডিম থেকে ২৪টি মুরগির ছানার জন্ম শুধু একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়, বরং ভবিষ্যতের এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার যে স্বপ্ন এত দিন কল্পবিজ্ঞানের গল্প মনে হত, তা এখন ধীরে ধীরে বাস্তবের রূপ নিতে শুরু করেছে।
জায়ান্ট মোয়া, ডোডো কিংবা ডায়ার উলফ— হারিয়ে যাওয়া এই প্রাণীরা আদৌ পৃথিবীতে ফিরবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বিজ্ঞান এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে অসম্ভব বলেও হয়তো আর কিছু থাকবে না।

