বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার বহুল আলোচিত ম্যাচ শেষ হয়েছে প্রায় এক সপ্তাহ আগে। কিন্তু সেই ম্যাচকে ঘিরে বিতর্কের রেশ এখনও কাটেনি। মাঠের লড়াই শেষ হলেও ম্যাচের ফল, রেফারিং এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হচ্ছে ফুটবল বিশ্বে। বিশেষ করে মিশর শিবিরের ক্ষোভ যেন দিন যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ২৪ নম্বরে থাকা মিশর শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে চলেছেন দলের ফুটবলার মোস্তাফা জিকো। এবার তিনি সরাসরি মন্তব্য করেছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে নিয়ে। একই সঙ্গে নিজের সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোকেই এগিয়ে রেখেছেন তিনি।
আর্জেন্টিনার জয়ের ম্যাচে লিওনেল মেসি একটি গোল করার পাশাপাশি একটি অ্যাসিস্টও করেছিলেন। পরিসংখ্যান বলছে, ম্যাচে আক্রমণভাগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকা। তবে সেই পারফরম্যান্সকে গুরুত্ব দিতে নারাজ মিশরের ফরোয়ার্ড মোস্তাফা জিকো।
জিকোর দাবি, পুরো ম্যাচে তিনি মেসির উপস্থিতিই অনুভব করতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, মেসি নিঃসন্দেহে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোকেই সবার ওপরে রাখেন।
জিকো বলেন, মেসি হয়তো সেরা খেলোয়াড়দের একজন, কিন্তু তাঁর মতে রোনাল্ডোই প্রকৃত সেরা। এমনকি তিনি দাবি করেন, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে মেসি মাঠে ছিলেন—এটাই নাকি বুঝতে পারেননি।
এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফুটবলপ্রেমীদের একাংশ জিকোর মন্তব্যকে আবেগপ্রসূত বলে মনে করছেন, আবার অনেকেই এটিকে পরাজয়ের হতাশার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
বিশ্ব ফুটবলে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর তুলনা বহু বছরের। দুই কিংবদন্তির অসংখ্য ভক্তের মতো মোস্তাফা জিকোও নিজের পছন্দ স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, রোনাল্ডোর প্রতি তাঁর আলাদা ভালোবাসা রয়েছে। তাঁর মতে, পরিশ্রম, ধারাবাহিকতা এবং মানসিক দৃঢ়তার দিক থেকে রোনাল্ডো এখনও সবার ওপরে অবস্থান করছেন। তাই মেসির প্রশংসা করলেও ব্যক্তিগত র্যাঙ্কিংয়ে তিনি পর্তুগিজ সুপারস্টারকেই এগিয়ে রাখেন।
ম্যাচ শেষে শুধু মেসিকে নিয়েই নয়, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়েও বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন জিকো। তাঁর দাবি, ম্যাচের শুরু থেকেই রেফারির বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত মিশরের বিপক্ষে গেছে।
জিকোর অভিযোগ অনুযায়ী, ম্যাচে ন্যায়সঙ্গত বিচার হয়নি এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে আর্জেন্টিনাই সুবিধা পেয়েছে। এমনকি তিনি দাবি করেন, ম্যাচের ফল আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং আর্জেন্টিনাকে জয়ী করতেই সবকিছু পরিচালিত হয়েছে।
এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে মিশরের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেছিলেন মোস্তাফা জিকো। এছাড়া তাঁর আরও একটি গোল বাতিল হয়, যা নিয়ে মাঠেই উত্তেজনা তৈরি হয়।
বাতিল হওয়া গোলের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মিশরের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ। প্রতিবাদের সময় দলের প্রধান কোচ হোসাম হাসান হলুদ কার্ডও দেখেন। সেই মুহূর্ত থেকেই ম্যাচের রেফারিং নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
অনেক সমর্থক সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যদিও ম্যাচ কর্মকর্তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি।
বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর দেশের সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন বার্তা দেন মোস্তাফা জিকো।
তিনি বলেন, দলের প্রত্যেক ফুটবলার দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কিছু সিদ্ধান্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে বলে তাঁর বিশ্বাস।
জিকোর মতে, খেলোয়াড়দের প্রচেষ্টা যথেষ্ট ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও হাতে চলে যায়। এমন মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেন যে পরাজয়ের জন্য নিজের দলকে দায়ী করতে রাজি নন।
মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসানও ম্যাচ শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জনপ্রিয় হওয়ার জন্য নয়, সত্য কথা বলতেই তিনি সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মিশরের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে এবং দলটি গুরুতর অবিচারের শিকার হয়েছে। ম্যাচ পরিচালনায় বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত তাঁদের বিরুদ্ধে গেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হাসানের এই মন্তব্য ফুটবলবিশ্বে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় এবং ম্যাচ-পরবর্তী আলোচনাকে আরও উসকে দেয়।
ম্যাচের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছে মিশর ফুটবল সংস্থা। সংস্থাটি রেফারিংয়ের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে।
তবে এখনও পর্যন্ত ফিফার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে।
ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের দিক থেকে এবারের বিশ্বকাপে উজ্জ্বল ছিলেন মোস্তাফা জিকো। টুর্নামেন্টে তিনি দুটি গোল করার পাশাপাশি একটি অ্যাসিস্টও করেন। শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তাঁর গোল মিশরকে ম্যাচে ফেরার আশা জাগিয়েছিল।
যদিও শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি, তবুও নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের ফলাফল বদলানোর আর কোনও সুযোগ নেই। তবে ম্যাচ ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক, রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন এবং জিকোর ধারাবাহিক মন্তব্য বিশ্ব ফুটবলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
একদিকে লিওনেল মেসির পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা, অন্যদিকে ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোকে সর্বকালের সেরা হিসেবে তুলে ধরা—সব মিলিয়ে জিকোর মন্তব্য নতুন করে উসকে দিয়েছে বহু বছরের ‘মেসি বনাম রোনাল্ডো’ বিতর্ক। এখন দেখার বিষয়, মিশর ফুটবল সংস্থার অভিযোগের বিষয়ে ভবিষ্যতে ফিফা কোনও আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেয় কি না।

