খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালজাতীয়দুর্নীতির মামলায় ১১ কাস্টমস কর্মকর্তার জামিন বাতিল করে জেলে প্রেরণ

দুর্নীতির মামলায় ১১ কাস্টমস কর্মকর্তার জামিন বাতিল করে জেলে প্রেরণ

অভিযুক্তরা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে বিদেশে পণ্য রফতানির ভুয়া তথ্য তৈরি করেন।

দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা বহুল আলোচিত এক মামলায় ১১ জন কাস্টমস কর্মকর্তার জামিন বাতিল করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মামলাটি প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা পাচার এবং প্রায় ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকার রফতানি প্রণোদনা আত্মসাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আদালতের এই আদেশকে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রোববার (১২ জুলাই) ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. শাহজাহান কবির শুনানি শেষে ১১ আসামির স্থায়ী জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

দুদকের প্রসিকিউটর দেলোয়ার জাহান রুমি বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এর আগে হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন নিয়ে গত ১৬ এপ্রিল বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করেছিলেন অভিযুক্তরা। সে সময় আদালত তাদের জামিন পরবর্তী ধার্য তারিখ পর্যন্ত বহাল রাখেন। পরে তারা স্থায়ী জামিনের আবেদন করলে দুদক তার বিরোধিতা করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।

আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস বিভাগের সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর কবির ও মবিন উল ইসলাম। এছাড়া সাবেক সহকারী কমিশনার মো. জয়নাল আবেদীনও এ তালিকায় রয়েছেন।

এ ছাড়া রাজস্ব কর্মকর্তা জমির হোসেন, এ এইচ এম নজরুল ইসলাম, আমির হোসেন সরকার, গৌরাঙ্গ চন্দ্র চৌধুরী, ফরিদ উদ্দিন সরকার ও মো. মঞ্জুরুল হককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুস সাত্তার এবং বাসুদেব পালকও আদালতের আদেশে কারাগারে গেছেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, অভিযুক্তরা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে বিদেশে পণ্য রফতানির ভুয়া তথ্য তৈরি করেন। সেই তথ্য ব্যবহার করে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এসেছে বলে দেখানো হয়। পরে সেই কাগজপত্রের ভিত্তিতে সরকারের রফতানি প্রণোদনার অর্থও উত্তোলন করা হয়।

দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং এতে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃত রফতানি না করেই সরকারি সুবিধা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন জাল নথি ও ভুয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল।

২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর দুদকের উপ-পরিচালক মো. আহসান উদ্দিন বাদী হয়ে ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ১১ জন কাস্টমস কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের আসামি করা হয়।

মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, দো এম্পেক্স লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও সিঙ্গাপুরে পণ্য রফতানির ভুয়া তথ্য উপস্থাপন করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেশে আনা হয়েছে বলে দেখানো হয়।

একই সঙ্গে রফতানি প্রণোদনা হিসেবে সরকার থেকে প্রায় ৩ কোটি ৭১ লাখ ৮১ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। অথচ তদন্তে দেখা যায়, ওইসব পণ্যের বড় একটি অংশ বাস্তবে বিদেশে কখনোই রফতানি করা হয়নি।

দুদকের তদন্তে জানা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৪১টি বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল করে সরকারি প্রণোদনা গ্রহণ করে।

তদন্তে দেখা গেছে, ৪১টি চালানের মধ্যে মাত্র সাতটির রফতানির সত্যতা মিলেছে। বাকি ৩৪টি চালানের বিপরীতে বিদেশে কোনো পণ্য পাঠানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তারপরও ওই চালানগুলোর বিপরীতে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে ২২ লাখ ১৮ হাজার ১৭ দশমিক ৪৪ মার্কিন ডলার দেশে এসেছে বলে দেখানো হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৮ কোটি ৬০ লাখ ৯১ হাজার টাকা।

এই অর্থ দেশে এসেছে বলে দেখিয়ে সরকারি রফতানি প্রণোদনার অর্থও উত্তোলন করা হয়, যা তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।

রফতানিকারকদের উৎসাহ দিতে সরকার নির্দিষ্ট খাতে নগদ প্রণোদনা দিয়ে থাকে। তবে সেই সুবিধা পেতে প্রকৃত রফতানির প্রমাণ, ব্যাংকিং নথি এবং কাস্টমস সংক্রান্ত তথ্যের যথাযথ মিল থাকা বাধ্যতামূলক।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা সরকারি এই ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া রফতানির তথ্য তৈরি করেন। এরপর সেই তথ্য বিভিন্ন দপ্তরে উপস্থাপন করে বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন দেখানো হয় এবং সরকারি প্রণোদনার অর্থ উত্তোলন করা হয়।

আদালতের সর্বশেষ আদেশের ফলে ১১ অভিযুক্ত এখন কারাগারে থাকবেন। মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং পরবর্তী শুনানিতে সাক্ষ্যগ্রহণসহ অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলার তদন্তে যেসব আর্থিক অনিয়ম ও প্রতারণার তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলোর ভিত্তিতেই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুয়া রফতানির মাধ্যমে সরকারি প্রণোদনা আত্মসাৎ দেশের অর্থনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। এ ধরনের অনিয়মের কারণে একদিকে সরকারের বিপুল অর্থের ক্ষতি হয়, অন্যদিকে বৈধ রফতানিকারকদের জন্যও প্রতিযোগিতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই মামলায় আদালতের সিদ্ধান্ত সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অর্থপাচার এবং জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মামলার চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে অভিযুক্তদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ হবে এবং আদালতের সিদ্ধান্তই হবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি।