বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টার ফাইনালে ১০ জনের সুইৎজ়ারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারের টিকিট নিশ্চিত করেছেন লিওনেল মেসিরা। কিন্তু স্কোরলাইন যতটা স্বস্তির, মাঠের পারফরম্যান্স ততটা নয়। দীর্ঘ সময় ধরে সুইসদের চাপে পড়ে থাকতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন ফুটবল খেললে সামনে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হতে পারে লিওনেল স্কালোনির দলকে।
ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল এটি হবে কৌশল আর ধৈর্যের লড়াই। আর্জেন্টিনা বলের গতি কমিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ম্যাচ রাখতে চাইলেও সুইৎজ়ারল্যান্ড দ্রুতগতির আক্রমণে বারবার চাপে ফেলেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
ফলাফল আর্জেন্টিনার পক্ষে গেলেও পুরো ম্যাচে সুইসদের লড়াকু মানসিকতা প্রশংসা কুড়িয়েছে। বিশেষ করে মাঝমাঠের দখল, দ্রুত পাসিং এবং আক্রমণে ওঠার গতি অনেক সময় আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল।
ম্যাচের ১০ মিনিটেই এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির নিখুঁত কর্নার থেকে অসাধারণ হেডে গোল করেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। বলের গতি ও দিক এতটাই নিখুঁত ছিল যে সুইৎজ়ারল্যান্ডের গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের কিছুই করার ছিল না।
শুরুতেই গোল পেয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেবে বলে মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু বাস্তবে ছবিটা ছিল ভিন্ন। গোলের পর সুইৎজ়ারল্যান্ডই ম্যাচের ছন্দ নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
সুইৎজ়ারল্যান্ড পুরো ম্যাচেই দলগত ফুটবলের অসাধারণ উদাহরণ দেখিয়েছে। আক্রমণে ছয়-সাতজন উঠে এসেছে, আবার রক্ষণেও দ্রুত সবাই নেমে গেছে। মাঝমাঠে গ্রানিত জাকা ও তাঁর সতীর্থরা আর্জেন্টিনাকে খুব কম সময়ই স্বাভাবিক খেলতে দিয়েছেন।
সুইস ফুটবলাররা ছোট ছোট পাসে আক্রমণ গড়েছেন, বলের দখল ধরে রেখেছেন এবং আর্জেন্টিনার রক্ষণকে নিজেদের অবস্থান ছেড়ে বের করে আনতে সফল হয়েছেন। তবে শেষ মুহূর্তে গোল করার দক্ষতার অভাবই তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
ড্যান এনদোয়ে ও ব্রিল এমবোলোর গতির সঙ্গে তাল মেলাতে বারবার হিমশিম খেয়েছে আর্জেন্টিনার ডিফেন্স। কাউন্টার অ্যাটাকে সুইৎজ়ারল্যান্ড একাধিকবার বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
৬৭ মিনিটে সেই চাপেরই পুরস্কার পায় সুইসরা। রিকার্ডো রদ্রিগেজের সঙ্গে দারুণ ওয়ান-টু পাস খেলে বক্সে ঢুকে ঠান্ডা মাথায় গোল করেন ড্যান এনদোয়ে। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করে ম্যাচে সমতা ফেরান তিনি।
এই গোলের পর ম্যাচের গতি পুরোপুরি বদলে যায়। আর্জেন্টিনা তখন স্পষ্টভাবে চাপে পড়ে।
সমতা ফেরানোর পর আরও আক্রমণাত্মক হওয়ার সুযোগ ছিল সুইৎজ়ারল্যান্ডের। কিন্তু সেই সময়ই বড় ভুল করে বসেন ব্রিল এমবোলো।
বক্সের বাইরে ফাউল আদায়ের আশায় নাটকীয়ভাবে পড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (VAR) সহায়তায় বিষয়টি ধরা পড়ে। আগেই একটি হলুদ কার্ড থাকায় দ্বিতীয় হলুদ দেখে মাঠ ছাড়তে হয় সুইস স্ট্রাইকারকে।
৭২ মিনিট থেকে ১০ জন নিয়ে খেলতে বাধ্য হয় সুইৎজ়ারল্যান্ড। ম্যাচের মোড়ও সেখান থেকেই ঘুরে যায়।
একজন কম নিয়েও সুইৎজ়ারল্যান্ড যেভাবে রক্ষণ সামলেছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। অনেক সময় বোঝাই যায়নি যে তারা একজন কম নিয়ে খেলছে।
আর্জেন্টিনা বলের দখল বাড়ালেও পরিষ্কার গোলের সুযোগ খুব বেশি তৈরি করতে পারেনি। বরং সুইস রক্ষণ বারবার মেসিদের হতাশ করেছে।
এই সময় লিওনেল মেসিও কয়েকটি নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট করেন। একবার তাঁর শক্তিশালী শট অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়। আরেকবার অসাধারণ সেভ করে দলকে বাঁচান গ্রেগর কোবেল।
নির্ধারিত সময়ে ম্যাচের নিষ্পত্তি না হওয়ায় খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
দীর্ঘ সময়ের চেষ্টার পর অবশেষে ২২তম অতিরিক্ত মিনিটে স্বস্তির গোল পায় আর্জেন্টিনা। প্রথমে মেসির শট ঠেকিয়ে দেন কোবেল। ফিরতি বলে দুর্দান্ত ফিনিশিং করে দলকে আবার এগিয়ে দেন হুলিয়ান আলভারেজ।
গোলটি আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে এবং সুইৎজ়ারল্যান্ডের লড়াই অনেকটাই কঠিন হয়ে যায়।
ম্যাচের একেবারে শেষদিকে আরেকটি দ্রুত আক্রমণ থেকে গোল করেন লাউতারো মার্তিনেজ। তাঁর গোলেই ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা এবং সেমিফাইনালের টিকিট হাতে তুলে নেয়।
স্কোরলাইন স্বস্তিদায়ক হলেও ম্যাচের পুরো চিত্র ছিল অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার একটি বড় সমস্যা আবারও স্পষ্ট হয়েছে। এগিয়ে যাওয়ার পরও তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারছে না।
আগের ম্যাচগুলোতেও একাধিকবার লিড নিয়েও গোল হজম করেছে স্কালোনির দল। সুইৎজ়ারল্যান্ডও একই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সমতায় ফিরেছিল। আরও শক্তিশালী দল হলে সেই ভুলের মূল্য অনেক বেশি হতে পারত।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো অতিরিক্ত মেসি-নির্ভরতা। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এখনও অধিকাংশ আক্রমণ মেসিকে ঘিরেই তৈরি হচ্ছে। প্রতিপক্ষ যদি তাঁকে আটকে দিতে পারে, তাহলে আর্জেন্টিনার আক্রমণ অনেকটাই নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে।
সেমিফাইনালে উঠলেও এই ম্যাচ আর্জেন্টিনাকে অনেক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। স্পেন, ফ্রান্স কিংবা ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে এমন ধীরগতির ফুটবল এবং রক্ষণে বারবার ভুল করলে জয় পাওয়া কঠিন হবে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে ম্যাচ জেতার মানসিকতা আবারও দেখিয়েছে স্কালোনির দল। শেষ পর্যন্ত সুযোগ কাজে লাগিয়ে ম্যাচ নিজেদের করে নেওয়ার ক্ষমতাই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি।
এখন দেখার বিষয়, সেমিফাইনালে আরও পরিপূর্ণ ফুটবল খেলতে পারে কি না মেসিরা। কারণ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে শুধু অভিজ্ঞতা নয়, পারফরম্যান্সেও ধারাবাহিকতা দেখাতে হবে।

